মোল্লার মৃত্যুদণ্ডে বিচারপতি ওয়াহহাবের ভিন্নমত যে কারণে

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার পূর্ণাঙ্গ আপিলের রায় প্রকাশ হয়েছে বৃহস্পতিবার।

প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ গত ১৭ সেপ্টেম্বর সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত রায়ে আবদুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

সংক্ষিপ্তভাবে দেয়া এ রায়ে পাঁচজন বিচারপতির মধ্যে চারজন কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার বিষয়ে একমত হলেও একজন দ্বিমত পোষণ করেন।

প্রধান বিচারপতি ছাড়াও আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা, বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

মৃত্যুদণ্ড রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ট্রাইব্যুনালের  দেয়া রায়ে আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত ১, ২, ৩ ও ৫ নম্বর অভিযোগে যে সাজা দিয়েছিলেন, তা বাতিল করে দিয়েছেন। এছাড়া ৪ নম্বর অভিযোগে দেয়া ট্রাইব্যুনালের খালাস আদেশ ও ৬ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ তিনি বহাল রেখেছেন।

যে ৬ নম্বর অভিযোগে কাদের মোল্লাকে আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে সেই ৬ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে আবদুল ওয়াহহাব মিঞা রায়ে তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘আমি ৩ নম্বর সাক্ষী মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করেছি। তিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে তদন্তের সময় যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে তাদের বাসায় যে বীভৎস ঘটনা ঘটেছিল তার সঙ্গে কাদের মোল্লা জড়িত ছিলেন না। সুনির্দিষ্টভাবে তিনি বলেছেন যে বিহারি ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ওই অপরাধ সংঘটিত করেছে। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ৩ নম্বর সাক্ষী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি।’

মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে রায় প্রদানকারী বিচারপতি তার রায়ে আরো বলেছেন, ‘ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায় থেকে আরো দেখা গেছে, ট্রাইব্যুনালের কাছে আসামিপক্ষ জল্লাদখানার তথ্য হাজির করার জন্য আবেদন করেছিলেন। ট্রাইব্যুনাল আবেদনটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সময় বিবেচনার জন্য নথিভুক্ত করে রাখেন।’

তিনি বলেন, ‘দেখা যায়, জল্লাদখানার সম্পর্কে ৩ নম্বর সাক্ষীসহ তিনজনের জবানবন্দির ফটোকপি দাখিল করা হয়। আসামিপক্ষ বলেছে- তারা এটি মিরপুরের জল্লাদখানা থেকে পেয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায় থেকে আরো দেখা যায়, ৩ নম্বর সাক্ষী যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য জল্লাদখানা সম্পর্কে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সেটি বিবেচনায় নেয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন।’

‘এছাড়া তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জল্লাদখানা সম্পর্কে ৩ নম্বর সাক্ষী মোমেনা বেগম যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে দেখা যায়, মোমেনা বেগম তার বাপ-মা, ভাইবোন হত্যার দুদিন আগে তার শ্বশুর বাড়িতে চলে যায়। যার কারণে সে প্রাণে বেঁচে যায়। সেও তার পিতা-মাতা, ভাই-বোনকে হত্যার জন্য অভিযুক্তকে (কাদের মোল্লা) দায়ী করেননি।’ পর্যবেক্ষণে ওয়াহহাব মিঞা।

তিনি বলেন, ‘এমনকি অভিযোগে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আমেনা বেগমকে ধর্ষণেরও কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।’ এ কারণে এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল থেকে দেয়া যাবজ্জীবন সাজার আদেশ বহাল রেখেছেন এই বিচারপতি।

এছাড়া কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল ১, ২, ৩ ও ৫ নম্বর অভিযোগে সাজা দিলেও আবদুল ওয়াহহাব মিঞা তার রায়ে বলেছেন, ‘এসব অভিযোগ সংঘটনের ক্ষেত্রে কাদের মোল্লার উপস্থিতি, উৎসাহ প্রদান বা সম্পৃক্ততার কোনো সন্দেহাতীত প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষ হাজির করতে পারেনি।’

উল্লেখ্য, কারা বিধি অনুযায়ী, সাধারণ ফৌজদারি মামলায় চূড়ান্ত আপিল খারিজের রায় বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়। এরপর বিচারিক আদালত মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়।

কারাবিধি অনুযায়ী রায় ঘোষণার দিন থেকে ৭ দিনের মধ্যে কাদের মোল্লা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারবেন। এ অবেদন নাকচ হলে তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে।

অবশ্য কাদের মোল্লার মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে হওয়ায় কারাবিধি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা থাকবে না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা

সুত্র:আরটিএনএন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।