প্রহসনের নির্বাচনকে ‘না’ এবং গণতন্ত্রকে ‘হ্যাঁ’ বলতে ২৯ তারিখে ঢাকায় আসার আহ্বান খালেদার

বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার অধীনে প্রহসনের নির্বাচনকে ‘না’ এবং গণতন্ত্রকে ‘হ্যাঁ’ বলতে বিজয়ের মাসে সবাইকে লাল-সবুজের পতাকা হাতে আগামী ২৯ ডিসেম্বর রবিবার ঢাকা অভিমুখে পদযাত্রা করার আহ্বান জানিয়েছেন ।  তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে এ আহ্বান জানান।

খালেদা জিয়া তার ঢাকা অভিমুখের এই পদযাত্রাকে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্রের জন্য অভিযাত্রা বলে অভিহিত করেছেন।  তিনি বলেন, ‘চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত, ব্যাপক ও পরবর্তী ধাপে উন্নীত করার লক্ষ্যে আমি আগামী ২৯ ডিসেম্বর রবিবার সারা দেশ থেকে দলমত, শ্রেণী-পেশা, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সক্ষম নাগরিকদের রাজধানী ঢাকা অভিমুখে অভিযাত্রা করার আহবান জানাচ্ছি।’  বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই অভিযাত্রা হবে নির্বাচনী প্রহসনকে ‘না’ বলতে, গণতন্ত্রকে ‘হ্যাঁ’ বলতে। এই অভিযাত্রা হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অর্থবহ নির্বাচনের দাবিতে।

এই অভিযাত্রা হবে শান্তি, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের পক্ষে। এই অভিযাত্রা হবে ঐতিহাসিক।’  আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আহবান, বিজয়ের মাসে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা হাতে সকলেই ঢাকায় আসুন। ঢাকায় এসে সকলে পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মিলিত হবেন।’  খালেদা জিয়া তার এই অভিযাত্রায় ব্যবসায়ী, সিভিল সমাজ, ছাত্র-যুবকদেরও দলে দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।  তিনি বলেন, ‘মা-বোনেরা আসুন, কৃষক-শ্রমিক ভাই-বোনেরা আসুন, কর্মজীবী-পেশাজীবীরা আসুন, আলেমরা আসুন, সব ধর্মের নাগরিকেরা আসুন, পাহাড়ের মানুষেরাও আসুন। যে যেভাবে পারেন, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, অন্যান্য যানবাহনে করে ঢাকায় আসুন। রাজধানী অভিমুখী জনস্রোতে শামিল হোন।’  সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী রাজধানী ঢাকাবাসীর প্রতি আহ্বান রেখে বলেন, ‘একই সঙ্গে যারা রাজধানীতে আছেন, তাদের প্রতিও আমার আহ্বান- আপনারাও সেদিন পথে নামুন। যারা গণতন্ত্র চান, ভোটাধিকার রক্ষা করতে চান, যারা শান্তি চান, যারা গত পাঁচ বছরে নানাভাবে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, শেয়ারবাজারে ফতুর হয়েছেন সকলেই পথে নামুন।’  তিনি জনতার এ অভিযাত্রায় কোনো বাধা না দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান। বলেন, ‘যানবাহন, হোটেল-রেঁস্তোরা বন্ধ করবেন না। নির্যাতন, গ্রেপ্তার, হয়রানির অপচেষ্টা করবেন না। প্রজাতন্ত্রের সংবিধান নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হবার অধিকার দিয়েছে। সেই সংবিধান রক্ষার শপথ আপনারা নিয়েছেন। কাজেই সংবিধান ও শপথ লঙ্ঘন করবেন না।’  খালেদা জিয়া প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে বাধা এলে জনগণই তা মোকাবিলা করবে।’  একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই কর্মসূচিতে বাধা এলে পরবর্তীতে কঠোর কর্মসূচি দেয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।’  বিরোধীদলীয় জোটনেত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলছি- দেশবাসীর এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সফল করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা আপনারা দেবেন।’  এই কর্মসূচির সাফল্যের জন্য খালেদা জিয়া পরম করুণাময় আল্লাহ্ রাব্বুল আল-আমীনের কাছে সাহায্যও কামনা করেন।  এই ঢাকা অভিমুখে অভিযান কর্মসূচির আগে চলমান সরকাবিরোধী আন্দোলনের চার দফা করণীয় ও নীতি-কৌশল তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা। এগুলো হলো;  ১। ভোটাধিকার হরণকারী ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রাণক্ষয়ী লড়াইয়ে যারা শরিক আছেন এবং হচ্ছেন তাদের মধ্যে সমন্বয়, সমঝোতা ও ঐক্য গড়ে তুলুন।  ২। বিভক্তি ও বিভাজনের বিষাক্ত রাজনীতির চির অবসান ঘটানোর জন্য জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে মূল্য দিন। জাতীয় ক্ষেত্রে বিতর্কিত বিষয়সমূহ অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ-আলোচনা এবং গণভোটের মধ্যদিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় মীমাংসার রাজনৈতিক সংকল্পকে জোরদার করুন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ যা চায় না দেশের সংবিধানে তা থাকতে পারে না।  ৩। ভোটকেন্দ্র ভিত্তিক সংগ্রাম কমিটিগুলোর পাশাপাশি দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনরত সকল পক্ষকে নিয়ে অবিলম্বে জেলা, উপজেলা ও শহরে ‘সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনী তামাশা প্রতিহত করুন। প্রতিটি জেলার প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখুন এবং জনগণের জান-মাল ও জীবিকার নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে স্ব স্ব নাগরিক দায়িত্ব পালন করুন এবং  ৪। গণতন্ত্রের এই সংগ্রামে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী, সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের জান-মালের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সরকারি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখুন, সজাগ থাকুন। কোনো প্রকার সাম্প্রদায়িকতাকে বরদাশত করবেন না।  সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে খালেদা জিয়া দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে চলমান রাজনৈতিক সংকট এবং এটি নিরসনে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উদ্যোগের বিস্তারিত বর্ণনা দেন।  কাদের কারণে এসব উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি তাও জানান। একই সঙ্গে খালেদা জিয়া নির্বাচন এবং সমঝোতা উদ্যোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন বক্তব্যের জবাব দেন।  সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা নিজেরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। এখন দেশকে পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছন্ন করে ফেলবেন না। এই দেশ, জাতি আপনাদের অনেক কিছু দিয়েছে। এখন সময় এসেছে দেশ ও জনগণকে কিছু দেওয়ার। একগুয়েমি ছেড়ে জনগণের জন্য কাজ করুন।’  খালেদা জিয়া আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। সমঝোতার সুযোগ আছে। আমি আপনাকে একতরফা নির্বাচন থেকে বিরত হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। আসুন আলোচনা করে আমরা চলমান সংকটের নিরসন করি।’  তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে এবং শাসক দলের পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত ও নাশকতায় যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন।  সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী নিহতদের শোকার্ত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান। যারা নির্যাতিত, ক্ষতিগ্রস্ত ও পঙ্গু হয়েছেন তাদের প্রতিও গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেন।  তিনি সারা দেশের জনগণ যেভাবে এই আন্দোলনে একাত্ম হয়ে নিভৃত পল্লী পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, সেজন্য তাদের অভিনন্দনও জানান। বলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন সফল হবেই, ইনশাআল্লাহ। জনগণের বিজয় অনিবার্য।’  সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আরএ গণি, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, লে. জেনারেল (অব.) মাহাবুবুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, ড. ওসমান ফারুক, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।  এছাড়া ১৮ দলের মধ্যে এলডিপির সভাপতি কর্নলে (অব.) অলি আহমদ, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।