অস্তিত্ব-সংকটে জামায়াত

দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে চার বছর ধরে আন্দোলন করছে জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আন্দোলনে সফলতার মুখ দেখেনি দলটি। বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে তারা। বর্তমানে দলটি এমনকি অস্তিত্বের সংকটে পড়তে যাচ্ছে।

একদিকে দলের শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের মুখোমুখি হওয়া, বিচার ঠেকাতে দেশব্যাপী জনমত না পাওয়া,  স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে আরো বেশি চিহ্নিত হওয়া, দলের নিবন্ধন বাতিল, মিডিয়ার সাঁড়াশি আক্রমণ এবং বিভিন্ন মামলায় হাজার হাজার নেতা-কর্মীর গ্রেফতার হওয়া- এসব মিলিয়ে কঠিন অবস্থায় জামায়াত। এ অবস্থায় ভেঙে গেছে দলের নেতাকর্মীদের মনোবল। গতি নেই সাংগঠনিক কর্মসূচিতেও।

এ ছাড়া শীর্ষস্থানীয় নেতাদের শূন্যতা কাটাতে না পারা, যোগ্য নেতৃত্বের অভাব, নেতাদের বর্তমান আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন, তরুণদের কাছে অপ্রিয় হয়ে ওঠা এবং বিরোধী পক্ষের জঙ্গি ও মৌলবাদ বলে তকমা দেয়া ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চরম সংকটে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

দলটির এই সংকটের জন্য দায়ী করা হচ্ছে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা সাবেক ছাত্রনেতাদের। তারাই এখন জামায়াতে ইসলামীকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই নেতারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তখন ওই ক্যাম্পাসগুলোতে অন্য কোনো ছাত্র সংগঠনকে থাকতে দেননি। দেখিয়েছেন চরম দাপট। এখন যেমন দেখাচ্ছে  ছাত্রলীগ । প্রতিপক্ষকে পিটিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া করার সংস্কৃতি তারা লালন করেছেন। জীবনযাপন করেছেন শাহেনশাহ স্টাইলে। এদের অনেকের ব্যাপারেই আর্থিক অসততার বিষয়টি দলের মধ্যে আলোচিত একটি বিষয়। সমাজে তাদের আলাদা কোনো পরিচয় নেই। তাদের পেশাই এখন রাজনীতি। এরা দূরদৃষ্টি নন। নিজেদের বাইরে সমাজে এদের কোনো অবস্থান নেই। জামায়াতে এসে এরা দ্রুত পদ পেয়েছেন। একটি চক্র গড়ে তুলেছেন। হয়েছেন ধনবান। মন্ত্রীর স্টাইলে জীবনযাপন করছেন। দলকে  স্বর্গরাজ্য ভেবে তারা জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে এসব নেতার প্রতি আস্থা কম। তাদের অভিযোগ এরা জামায়াতকে ইসলামী দল থেকে সরিয়ে এনে আর দশটা রাজনৈতিক দলে মতো তৈরি করেছেন। আদর্শ বলতে দলটির আর কিছু নেই। নিজেদের অর্থ-সম্পদ ধরে রাখতেই তাদের আন্দোলন-সহিংসতা।

অন্যদিকে সরকারের সাঁড়াশি আক্রমণে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বাড়িছাড়া, ঘরছাড়া, সংসারছাড়া। তাদের মধ্যে এখন হতাশা।

মতিঝিল থানা জামায়াতের এক কর্মী বলেন, “নেতাদের মুক্তিসহ সব ধরনের আন্দোলনে রাজপথে নামার বিষয়ে প্রথম দিকে এক ধরনের জেদ ছিল কর্মীদের মনে। এখন আর তেমনটি নেই। সরকারের উগ্র আচরণে আমাদের কর্মীদের মধ্যে কিছুটা হতাশা জন্মেছে, এটা ঠিক।”

ওই কর্মী আরো বলেন, “কর্মসূচি সফল করার তো কোনো সুযোগ নেই। সরকার আমাদের রাজপথে থাকতেই দিচ্ছে না। রাজপথে নামলেই পুলিশ গুলি ছোড়ে। আমাদের এই চার বছরে অনেক নেতাকর্মী মারা গেছেন। এসব দেখে কর্মীদের পরিবার থেকেও রাজপথে নামতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।”

জানা গেছে, সারা দেশে সরকারের কঠোর তৎপরতায় জামায়াত মুষড়ে পড়েছে। জেলা ও থানা পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতা কারাগারে আটক। জামিন হচ্ছে না তাদের। সব কার্যালয় তালাবদ্ধ। এমনও এলাকা রয়েছে, যেখানে কেন্দ্র ঘোষিত কোনো কর্মসূচিও পালিত হয় না। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের তৎপরতা চলছে অনেকটা নিষিদ্ধ সংগঠনের মতো।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর প্রথমে জঙ্গিবাদ, পরে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে দৃশ্যত গৃহবন্দী হয়ে পড়ে জামায়াত। সবচেয়ে ভয়ংকর বিপদ হলো মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সাজা দেয়ার পাশাপাশি দল হিসেবে জামায়াতকেও অভিযুক্ত করেছে ট্রাইব্যুনাল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের সক্রিয় বিরোধিতা করে তারা। তাদের বিপক্ষে হত্যা, নারী নির্যাতন, লুণ্ঠনসহ বহু অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। প্রথম দিকে জামায়াতকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও জামায়াতের নেতা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রায়ের পর সরাসরি ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে  আখ্যায়িত করা হয়েছে দলটিকে।

জামায়াত প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া পাঁচটি রায়ের মধ্যে চারটিতেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে পাকিস্তানি সেনাদের ‘সহযোগী বাহিনী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধকালীন নৃশংসতার জন্য পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি জামায়াতকেও দায়ী করেছেন। এতে দলটি নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।

এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মী ফারুক হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে পুলিশের  চিরুনি অভিযান চলে। এটি ছিল দলটির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের সময় প্রথম ধাক্কা। সরকারের শেষ সময়ে জামায়াতবিরোধী সাঁড়াশি আক্রমণ ও মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারের ফলে দলটিতে নতুন করে কেউ যোগ দিচ্ছে না। পুরনো অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

এ ছাড়া হাইকোর্টে দলটির নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায় দেয়া হয়েছে। আপিল করে আইনি লড়াই চালিয়েও নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার বিষয়েও আত্মবিশ্বাসী নন খোদ দলটির নেতারাও। আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জামায়াত চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ, শীর্ষ নেতাদের সব রায়ই কার্যকর করা, একই সঙ্গে তাদের ছাত্রসংগঠন শিবিরকেও নিষিদ্ধ করা হতে পারে। এখন দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার চিন্তা-ভাবনাও করছে সরকার।

এসব ঘটনায় নেতৃত্বের সংকটসহ দলটি সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের। এ অবস্থায় দলের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে হাল ধরেছেন তৃতীয় সারির নেতারা। দলের এই হাইকমান্ড বিচারের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানানোর লক্ষ্য সামনে রেখে সহিংস হরতাল-ভাঙচুর করতে গিয়ে জামায়াত-শিবিরের বহু নেতাকর্মী কারাবন্দী রয়েছেন, কেউবা গ্রেফতার এড়াতে এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন।

জানা গেছে, হাইকমান্ডের এসব সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী। জামায়াত ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন হওয়ার দলীয় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ কথা বলতে পারছেন না। এ জন্য সবাই চুপচাপ থাকছেন।

বর্তমান নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে অনেকের। নেতাকর্মীরা বলছেন, “যোগ্য নেতৃত্ব না থাকায় বর্তমানে দলের এ নাজুক পরিস্থিতি। যদি আক্রমণাত্মক ভূমিকায় না গিয়ে কৌশল অবলম্বন করে চললে সংগঠন বাঁচত; সংগঠনের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হতো না, শত শত প্রাণও ঝড়ে না।”

জোটের অন্যতম শরিক দল বিএনপি সাম্প্রতিককালে জামায়াতে ইসলামীর এ বেহাল দশায় রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। তারা জামায়াত-শিবিরকে আগের মতো প্রকাশ্য সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থন দানে বিরত রয়েছে। কেবল ব্যবহার করতে চাইছে। এই অভিযোগ জামায়াতের নেতাকর্মীদের। ছাত্রদল তো ঘোরতর জামায়াত বিরোধী। এরা এই মুহূর্তেই জামায়াত নেতাদের ফাঁসি চায়।

খালেদা জিয়া জামায়াত-শিবির কর্মীদের পছন্দ করেন-এমন দাবি দলটির। এই নিয়ে জামায়াতের তরুণ নেতারা শ্লাঘা বোধ করতেন। কিন্তু তারাই বলছেন বিএনপির অনেক নেতাই জামায়াতের ঘোর বিরোধী।

আর এ কারণেই জামায়াত এখন ১৮ দলের কর্মসূচিতে আর আগের মতো সক্রিয় হচ্ছে না। তারা দেখছে বিএনপি কী করে। বিএনপি সক্রিয় হলে তারা সক্রিয় হবে-নতুবা নয়। আর দলের নেতাদের মুক্ত করতে কী করবে-তা  নিয়ে দলের মধ্যেই নানা মত তৈরি হয়েছে। এখন দলের অনেকেই বলছেন সহিংসতা দিয়ে নেতাদের মুক্তি সম্ভব নয়। আর এতে করে দলটি আরো বেশি সমালোচনার মুখে পড়ছে। তাহলে জামায়াত কী করবে? নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝা গেছে-এই প্রশ্নের জবাব তাদের জানা নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।