শেখ হাসিনা স্বৈরাচারের’ কলঙ্ক নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন

বিশ্বখ্যাত বৃটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ জানুয়ারির ‘প্রহসনের’ নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা হয়তো বছর খানেক ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। এরপর ‘স্বৈরাচারের’ কলঙ্ক নিয়ে তাকে বিদায় নিতে হবে।

শুক্রবার ‘ইলেকটোরাল ফার্স ইন বাংলাদেশ, দ্য মাইনাস-ওয়ান সলিউশন (বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রহসন, একজনের বিদায়ে সমাধান)’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব মন্তব্য করা হয়।

প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো;
ঢাকার গুলশানে কূটনৈতিক এলাকার ৭৯নং রোড। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের হাল দেখার জন্য এখন এটা একটা ভালো জায়গা। এখানে একটি বাসার দুদিক আটকে রাখা হয়েছে ৫টি বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে। রয়েছে অসংখ্য পুলিশের অবস্থান। বাসার অপর দিকটি রাশিয়ান দূতাবাসের উঁচু দেয়াল। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া গৃহবন্দি অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। তার সঙ্গে দেখা করতে আসা সমর্থকদের হয় গ্রেপ্তার করা হয়েছে অথবা আটক রাখা হয়েছে বা ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরেক দফা শপথ গ্রহণের আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আসন্ন সাধারণ নির্বাচন শুধুই নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। ৫ জানুয়ারি এ নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। কিন্তু এর ফলাফল কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই সবার জানা। খালেদা জিয়ার বিএনপি এবং তাদের অপর ১৭টি জোটভুক্ত দল নির্বাচন বর্জন করছে। আর নির্বাচন বর্জনে সুর মেলানোর জন্য সরকার জাতীয় পার্টির প্রধান এবং সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মাদ এরশাদকে হাসপাতালে আটক করে রেখেছে।

অন্যদিকে দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, তাদের গঠনতন্ত্র দেশটির সেক্যুলার সংবিধানের পরিপন্থি।

সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না। ৯ কোটি ২০ লাখ ভোটারের মধ্যে ৪ কোটি ৮৩ লাখ (প্রায় ৫৩ শতাংশ) ভোটারই ভোট দিতে পারবেন না। ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে নির্বাচন হবে মাত্র দুটি আসনে। যারা ভোট দিতে পারছেন তারাও হয় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী এবং অথবা তাদের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের মধ্যে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে পারবেন।

খালেদা জিয়া ২৯ ডিসেম্বর গণসমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন। ঢাকায় প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে আর এক হাজারেরও বেশি বিরোধীদলীয় সমর্থক-কর্মীকে আটক করে পুলিশ তা বানচাল করে দেয়। কর্মসূচির দিন যেখানে সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল, বিএনপির প্রধান কার্যালয়ের সামনে সংবাদকর্মীরা শুধু সতীর্থ সংবাদকর্মীদের ক্যামেরাবন্দি করার সুযোগ পেয়েছেন।

শহরের অন্যত্র বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা সুপ্রিমকোর্টের প্রধান ফটকের ভেতরে প্রতিবাদ করতে সমবেত হন যেখানে পুলিশ জলকামান আর সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। পরে লাঠিসোটা হাতে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা গেট ভেদ করে সুপ্রিমকোর্টের ভেতরে প্রবেশ করে বিরোধী সমর্থক আইনজীবীদের তাড়া করে এবং মারধর করে। নীরব দর্শকের মতো পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে।

লাঠিয়াল কর্মীরা রাস্তায় নেমে পড়ে বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে সামনা-সামনি টক্কর দেয়ার জন্য। কিন্তু কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে ওইদিনের সহিংসতায় মারা গেছেন ২ জন।

২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। অথচ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ। এরপরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা প্রণয়ন করা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা দূর করে ২০১৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠান করাটা আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫ জনের মধ্যে ৪ জন বাংলাদেশি (প্রায় ৮০ শতাংশ) তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের বিপক্ষে।

এখন বিএনপির অবস্থা একেবারেই এলোমেলো। শেখ হাসিনা আর আওয়ামী লীগ তাদের নিজেদের পতন নিজেরাই ডেকে নিয়ে আনবে। তার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই তাদের। গত কয়েক মাসে বিএনপি তাদের অবরোধ কর্মসূচি জোরদার করে। সপ্তাহে মাত্র একদিন বাদ রেখে বাকি সবদিন অবরোধ পালন করেছে তারা। তাদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও সহিংসতা চালাচ্ছে। চলতি বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছেন ৫ শতাধিক মানুষ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমন সহিংসতা আর হয়নি।

আওয়ামী লীগ বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনলেও এবার নির্বাচনী হলফনামায় দেখা যাচ্ছে যে, ২০০৮ সালের পর শেখ হাসিনার একজন ভাতিজার সম্পদ বেড়েছে ৩৩০ গুণ। নির্বাচন কমিশনকে ওই তথ্য প্রকাশ বন্ধে রাজি করাতে না পেরে শেখ হাসিনা তার আত্মীয় কারা তা জনসমক্ষে বলতে বাধ্য হন। এতে তার লোভী ভাজিতা ও চাচাতো ভাইদের আত্মীয়ের তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।

ধারণা করছেন একচ্ছত্র শাসক (একনায়ক) হিসেবে শেখ হাসিনা এক বছরের বেশি টিকতে পারবেন না। তারই একজন উপদেষ্টার মতে, নতুন সরকার হবে স্বল্পমেয়াদী। একই সঙ্গে তিনি এও যোগ করেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া সরকারের অন্য কোনো উপায় নেই।

ঢাকায় এখন বিতর্ক চলছে কে হাসিনার পতন ঘটাবে। এটা হতে পারে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা অথবা বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। অর্থনৈতিক অচলাবস্থার কারণে পতনে সময় লাগবে। অন্যদিকে সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক রক্ষা করছে এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সেনাবাহিনী ২০০৭ সালের মতো করে আর মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে চায় না।

একজন সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা স্বীকার করেন, যখন হাসিনার পতন হবে তখন নির্বাচনে জিতবে বিএনপি। কিন্তু এর ফলে শেখ হাসিনার শাসনকাল স্বৈরাচারী শাসনকাল হিসেবে কলঙ্কিত হয়ে থাকবে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, খালেদা জিয়া যেমন তার ছেলে তারেক রহমানকে উত্তরসূরি নির্বাচিত করেছেন, শেখ হাসিনা তাও করেননি।

আগামী ৫ বছর ক্ষমতায় থাকার জন্য খালেদা জিয়াকে হয়তো বছর খানেকের মতো সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে ক্ষমতায় গিয়ে শেখ হাসিনার নিজ জেলা গোপালগঞ্জের নাম পরিবর্তনের হুমকি দিলেও খালেদা জিয়া জানেন যে, এখন যে (বালুর ) ট্রাক দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, এক সময় সেই ট্রাকই হয়তো তার পারিবারিক শাসনকে রক্ষা করবে।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।