খালেদা জিয়ার বক্তৃতা : দেশ বিদেশে আলোড়ন

ঢাকামুখী জাতীয় পতাকা মিছিল কর্মসুচিতে ‘নিজ গৃহে আটক’ থেকে মুক্ত হওয়ার পর প্রথম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেয়া বেগম জিয়ার বক্তৃতা দেশ-বিদেশে আলোড়ন তুলেছে। দেশের মানুষ যেমন উদগ্রীব ছিলেন বক্তৃতা শোনার জন্য; তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসূত্রে বসবাসরত বাংলাদেশীরা (প্রবাসী) উদগ্রীব হয়েছিলেন বেগম জিয়ার বক্তৃতা শোনার জন্য। দেশে রাজধানী ঢাকার বাইরে বসবাসরত মানুষ যেমন টিভির সামনে ভিড় করেছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেয়া বেগম জিয়ার বক্তৃতা শোনার জন্য; তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ ফেলে টিভির সামনে জড়ো হন শত শত মানুষ। এমনকি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সউদী আরব, ইতালি, ব্রাজিল, আমেরিকা, ব্রিটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশে বিএনপির নেতাকর্মীসহ জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণা মানুষ দল বেঁধে জড়ো হয়ে টিভিতে বেগম জিয়ার বক্তৃতা শুনেছেন। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশের একজন সিনিয়র সাংবাদিক জানান,  ওই দেশের বিভিন্ন শহরে প্রচুর লোক কাজ ফেলে টিভিতে বেগম জিয়ার বক্তৃতা শুনেছেন। সভা সমাবেশে যাওয়ার মতো করে দল বেঁধে মানুষ টিভিতে সরাসরি বক্তৃতা দেখেছেন। তিনি জানান, মিডিয়ায় খবরে পুরো বক্তৃতা দেখানোর সুযোগ নেই সেটা মানুষ বোঝে। এজন্য সরাসরি বেগম জিয়ার সম্পূর্ণ বক্তৃতা শুনতে ঘণ্টাওয়ারি মজুরির কাজ ফেলে টিভির সামনে জড়ো হয়।
বিএনপির চেয়ারপার্সন ১৮ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বক্তৃতা ছিল গতকাল টক অব দ্য কান্ট্রি। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সর্বত্র বেগম জিয়ার বক্তৃতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাসে ট্রেনে এমনকি টিভির টকশোগুলোতে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। অনেকেই কাজ ফেলে দেশনেত্রীর বক্তৃতা শোনার জন্য টিভির সামনে বসে থাকেন। শুধু দেশে নয়, বাংলাদেশের যারা বিদেশে থাকেন তাদের অনেকেই কাজ ফেলে টিভির সামনে বসেন বক্তৃতা শোনার জন্য। যেসব দেশে ঘণ্টা অনুযায়ী কাজের মজুরি দেয়া হয় সেসব দেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের অনেকেই বেগম জিয়ার বক্তৃতা শোনার জন্য কাজ বাদ দিয়ে টিভির সামনে বসেন। মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, বৃটেন, আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কযেকশ বাংলাদেশী একসঙ্গে টিভিতে বেগম জিয়ার বক্তৃতা শোনেন। বেগম জিয়া বক্তৃতায় জঙ্গিবাদ, মুক্তিযুদ্ধ, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণ, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন, ছবি তুলে ধরায় সাধারণ মানুষ দারুণ খুশি। বিশেষ করে প্রবাসীদের মন্তব্য এমন, এসব বিষয়ে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করার প্রয়োজন ছিল।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনের সমাবেশে প্রথমে দৈনিক ইনকিলাব ও  প্রথম আলোর ৬ জানুয়ারির সংখ্যা তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, যারা ভোটার, তারা সেদিন ভোটকেন্দ্রে যাননি। ছবিতে কুকুর শুয়ে রয়েছে ভোটকেন্দ্রে। প্রথম আলোর সেদিনের শিরোনাম পড়ে শুনিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন- এই সরকার ‘কলঙ্কিত’ সরকার। খালেদা জিয়া অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনে মানুষের সমর্থন না পেয়ে ব্যর্থতা ঢাকতেই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে। হিন্দু ভাইদের বাড়ি-ঘরে হামলা করছে, তাদের ওপর নির্যাতন করছে, বাড়িঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করছে, দখল করছে আওয়ামী লীগের লোকজন। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার দায়দায়িত্ব সরকারের। সরকার ব্যর্থ হয়েছে নিরাপত্তা দিতে, হামলাকারীদের ধরতে। বেগম জিয়া বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জঙ্গিবাদ দমন করবে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে যশোরে উদিচী, গোপালগঞ্জে গির্জা, পল্টনে সিপিবির সমাবেশে ও রমনা বটমূলে বৈশাখী মেলায় হামলা হয়েছিল। একটারও বিচার করেনি আওয়ামী লীগ সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সরকারের সময়েই দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছিল। কেবল বিএনপির পক্ষেই জঙ্গিবাদ দমন করা সম্ভব। বেগম জিয়ার এসব বক্তব্য ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশের একজন সিনিয়র সাংবাদিক জানান, সে রাজধানীর আশপাশে কর্মরত শ্রমিকরা ২/১ ঘণ্টা কাজ বন্ধ রেখে টেলিভিশনে বেগম জিয়ার বক্তৃতা শুনেছেন। তাদের অনেকেই মন্তব্য করেছেন জঙ্গিবাদ নিয়ে এতোদিন সরকার যে দায় বিএনপির ওপর চাপিয়েছিল; বিদেশিদের ভুল বুঝিয়েছিল; এই বক্তব্যের মাধ্যমে সেটা ধোপেই টিকবে না। দুবাই, জেদ্দা, ল-ন, নিউইয়র্ক, ক্যানাড়া, অষ্ট্রেলিয়ায় বসবসারত প্রবাসীরাও বেগম জিয়ার বক্তৃতা শুনে খুশি। বক্তৃতা শোনার পর অনেকেই উল্লসিত হয়ে একে অন্যকে মিষ্টি খাইয়েছেন। দুবাই এবং সউদী আরবে কর্মরত দুজন প্রবাসী জানান, সেখানে  মানুষ কাজ ফেলে রেখে সভা সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার মতো করে দল বেঁধে টিভির সামনে জড়ো হয়েছে। বক্তৃতার পর বেগম জিয়ার নামে শ্লোগানও দেয়া হয় বলে ওই প্রবাসীরা জানান।
বেগম জিয়ার বক্তব্যে দেশের মানুষ দারুণ খুশি। আরিফ নামে একজন স্কুল শিক্ষক বেগম জিয়ার বক্তৃতা শোনার পর এই বলে মন্তব্য করেন যে,  বিএনপি নেত্রী যে হরতাল অবরোধ দেননি তা খুবই পজেটিভ। কারণ কিছুদিনের জন্য হলেও স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ থাকবে। বেগম জিয়া নমনীয় হলেও প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানে মানুষ শঙ্কিত। তিনি বলেন, সমস্যার সমাধান প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিনি নমনীয় না হলে ১৮ দল আবার হরতাল অবরোধ কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।
বেগম জিয়া গতকাল যখন বক্তৃতা দেন তখন অফিস ছুটি হয়ে গেছে। অফিস ছুটির পর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে একটি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মী নিজস্ব বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাদের একজন বলেন, বেগম জিয়া যে বক্তৃতা দিলেন তাতে মনে হয় সংকট সমাধানে আলোচনার ব্যপারে তিনি নমনীয়। সরকারের উচিত এই সুযোগ নেয়া। পাশের একজন বলেন, সরকার ভোটের আগে বলেছিল- “সংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নিয়ম রক্ষার জন্যই এ নির্বাচন।” এখন তারা বলছেন ৫ বছর ক্ষমতায় থাকবে। বেগম জিয়ার বক্তৃতার পর যদি সরকারের হুঁশ না হয় তাহলে দেশ চরম সংকটে পড়বে। টেলিভিশনের টকশোতে বেশ কয়েকজন বেগম জিয়ার বক্তৃতার পজেটিভ দিকগুলো তুলে ধরে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধান করে নির্বাচনের আয়োজন করা উচিত বলে মত দেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।