সারা দেশ মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে: খালেদা

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গুম-খুনে জড়িতদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে  বলেছেন, কাকে কার নির্দেশে গুম-খুন করছেন একদিন তার বিচার হবে।

গুম-খুন ও অপহরণের প্রতিবাদ এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে রবিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির গণঅনশন কর্মসূচিতে তিনি এ হুঁশয়ারি উচ্চারণ করেন।

খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান সরকার অবৈধ, তারা জোর করে ক্ষমতায় এসে এসব অবৈধ কাজ শুরু করেছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগ সারাদেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই এই সরকারের। কারণ তারা নিজেরাও এসবে জড়িত।

তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন নারায়ণগঞ্জে কী আহাজারি চলছে। শুধু নারায়ণগঞ্জই নয়, সারা দেশ যেন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, নীলফামারী, যশোর, লক্ষ্মীপুর, বগুড়া ও দিনাজপুরসহ সারা দেশে গুম-খুন চলছে। এ সব বন্ধে সরকার কী ভূমিকা রেখেছে?

নজরুল হত্যাকারীরা সরকারের লোক
প্যানেল নজরুল হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় সরকারের সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তাদের বিচার হয় না, তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কারণ তারা সরকারেরই লোক।’

তিনি বলেন, ‘নূর হোসেন একজন ক্রিমিনাল। জনগণ তার বিচার দেখতে চায়, তাকে কারাগারে দেখতে চায়। ঘটনার সাতদিন পরে কেন তার বাড়িতে অভিযান চালানো হলো? তাদের কাছে তাহলে কী প্রশাসনও অসহায়?’

সরকারের হাতে রক্ত আর রক্ত
বিএনপি চেয়ারপারসন, আমরা আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে সকল গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। অবিলম্বে তাদের পরিবারের কাছে ফেরত দিতে হবে।

সরকারকে খুনি আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘আজ দেশের জনগণের চোখে শুধু পানি আর পানি, অন্যদিকে সরকারের হাতে শুধু রক্ষ আর রক্ত। এরা যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন দেশের মানুষের রক্ত ঝরতেই থাকবে।’

খালেদা জিয়া বলেন, গুম করে আওয়ামী লীগ আর দোষ চাপায় অন্যের ওপর। সরকার কথায় কথায় বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপায়। বিএনপি কখনো গুম- খুনের রাজনীতি করে না। আপনারা স্মরণ করে দেখেন সিরাজ শিকদারকে কারা খুন করেছে।

দাগী সন্ত্রাসীদের ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা করে তাদের ধরে এনে গুম করতে র‌্যাব গঠন করা হয়নি। এই সরকার নিজেদের কাজে ব্যবহার করে র‌্যাবের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে।’

‘জো হুকুম হ্যায়, উয়ি পালন করনা হ্যায়’
১৯-দলীয় জোট নেত্রী বলেন, ‘আমরা সবসময় জনকল্যাণমুখি কর্মসূচি দিয়ে থাকি। কারণ আমরা এই দেশেরই মানুষ। এই দেশের মানুষের উন্নতি আমরা চাই।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার জনগের কল্যান চায় না। তারা গোলামী করে সবকিছু বিকিয়ে দিতে চাইছে।’

আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আপনারা দাস নয় ক্রীতদাস। আপনারা নিজের ইচ্ছেয় চলতে পারেন না। চলেন তো দাদাদের কথায়- ‘জো হুকুম হ্যায়, উয়ি পালন করনা হ্যায়।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘দেশে মানুষ আজ কর্মসূচির জন্য অপেক্ষায় আছে। এসব গুম হত্যা বন্ধ না হলে আমরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।’

বিশেষ জেলার পুলিশ বেপরোয়া
প্রশাসনকে দলীয়করণের অভিযোগ করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ একটি জেলার লোকদের পুলিশ প্রশাসনে নিয়েগ দেয়া হয়েছে। তারা বেপরোয়া আচরণ শুরু করেছে।’

তাদের প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে না, তখন আপনারা কোথায় যাবেন? কাকে কার নির্দেশে গুম-খুন করছেন তার বিচার হবে।’

নির্বাচন দিতেই হবে
খালেদা জিয়া বলেন, অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে না জেনে তারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে ভয় পায়। আওয়ামী লীগ কখনো জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসেনি।

সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে থাকা চামচারা পাঁচ বছরের আগে নির্বাচন হবে না বলে যতই লাফালাফি করুক না কেন তাতে লাভ নেই, নির্বাচন দিতেই হবে। চামচারা কতটি হত্যা করেছে আর কত টাকা লুট করেছে তার হিসেব জনগণ রেখেছে।’

জিয়া-মঞ্জুর খুনি এরশাদ
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে দেশের জনগণ আছে আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে খুনি। তারা সব সময় খুনিদের সাথে জোট বাঁধে। আপনাদের সাথে আছে খুনি এরশাদ- সে জিয়াউর রহমান ও জেনারেল মঞ্জুর খুনি।’

এ সময় শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘খুনিদের সঙ্গে আপনার বসবাস, খুনিকে উপদেষ্টা বানিয়ে পার পাবেন না। খুনি এরশাদকে পাশে পাওয়ার জন্য এই সরকার তার বিচারের রায় পিছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একদিন এর বিচার হবে।’

চোখে পানি নয়, রুখে দাঁড়াতে হবে
গুমের শিকার স্বজনদের উদ্দেশে খালেদা বলেন, ‘অনেক সহ্য করেছি, আর না। এবার চোখের পানি মুছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এদের রুখে দাঁড়াতে হবে। গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’

শান্তিপূর্ণ এ কর্মসূচিকেও সরকার ভয় পায় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘বাইরে দেখুন জলকামান ও রায়টকার দাঁড়িয়ে আছে। এ কামান একদিন অন্যদিকে ছুটবে- ইতিহাস তাই বলে।’

বিএনপি সরকারের আমলে গুম-খুনের ঘটনা ঘটেনি জানিয়ে দলটির চেয়ারপারসন বলেন, ‘এসব গুম-খুন আপনাদের আমলে শুরু হয়েছে। বিশেষ এলাকার পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত।’

বক্তব্য শেষে সন্ধ্যা ৬টার কিছুক্ষণ আগে খালেদা জিয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে জুস খাইয়ে গণঅনশন কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

গণঅনশনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান নেতা আবদুল লতিফ নেজামী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, এমকে আনোয়ার, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান ও মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, গণস্বাস্থ কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ, জামায়াত নেতা রেদোয়ান উল্লাহ শাহিদী, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, শামসুজ্জামান দুদু ও এজেডএম জাহিদ হোসেন, বিএনপি যুগ্ম-মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।