আন্দোলনের হুংকার আছে, বাস্তবে প্রস্তুতি নেই

দশম সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই সরকার পতনের হুংকার দিয়ে আসছে বিএনপি। তবে রমজান মাসে তাদের এই হুংকারের মাত্রা ছিল লক্ষণীয়, যেখানে ছিল ঈদের পর জোরেশোরে আন্দোলনে নামার হুমকি। তাতে বাধা এলে এর পরিণতির বিষয়েও সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি ছিল দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামসহ সব সারির নেতাদের মুখে।

ঈদ-পরবর্তী আন্দোলনের জন্য বিএনপির নেতাদের মধ্যে  যে মাত্রায় হুমকি শোনা গেছে, বাস্তবে সে মাত্রায় প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না তাদের মধ্যে। এখনো চূড়ান্ত হয়নি তাদের আন্দোলন কর্মসূচি। এমনকি দল পুনর্গঠনের কাজেও চলছে ধরিগতি।

তবে দলের একটি সূত্র জানায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও ২০ দলের শরিকদের সঙ্গে বৈঠক করে শিগগিরই আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে। এই কর্মসূচি হবে আগামী আন্দোলনে সমর্থন জোগাতে জনসম্পৃক্ততামূলক ও শান্তিপূর্ণ। প্রাথমিকভাবে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে জনসভা, পথসভা, বিক্ষোভ, অনশন ও গণমিছিল কর্মসূচি দেয়া হতে পারে। এ ছাড়া এ মাসের মাঝামাঝি সময় ঢাকায় একটি মহাসমাবেশের ঘোষণা আসতে পারে। সেখান থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।

এদিকে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে বিএনপির মাঠে নামার হুমকির পাল্টা জবাব দিচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। তারা এমনকি বিএনপির আন্দোলনের সক্ষমতা নিয়েও কটাক্ষ করছে।

রমজান মাসে রাজধানীতে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঈদের পর আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেন। পরে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও তার সঙ্গে সুর মেলান।

রমজানে ঢাকা মহানগর বিএনপির ইফতারে অংশ নিয়ে ঈদ-পরবর্তী আন্দোলন নিয়ে দলের প্রধান খালেদা জিয়া বলেছিলেন, “ঈদের পরে বিএনপির আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ। পুলিশ ও অস্ত্র দিয়ে সে আন্দোলনে বাধা দেয়ার চেষ্টা হলে পাল্টা জবাব দেয়া হবে।”

বিএনপির আন্দোলনের হুমকি প্রসঙ্গে সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “মাঠের খেলা মাঠেই হবে। মাঠে নামুক না। মাঠে আওয়ামী লীগ আছে, মানুষও আছে।”

পরবর্তী সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন শুরুর হুঁশিয়ারি দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর হত্যা-গুম বন্ধ না হলে গুপ্তঘাতক ও চক্রান্তকারীদের উচ্ছেদ করতে বিএনপি ঐতিহাসিক প্রতিশোধ নিতে বাধ্য হবে বলে হুংকার দিয়েছিলেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তবে বিগত আন্দোলনে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে সাংগঠনিক দুর্বলতা মেনে নিয়ে এবার আন্দোলনে নামার আগে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে দলটি। এরই অংশ হিসেবে গত ১৮ জুলাই ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।

নানা সূত্রে জানা যায়, খুব শিগগির যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নতুন কমিটি দেয়ার চিন্তা চলছে দলের শীর্ষ পর্যাংয়ে। তা অনেকটা চূড়ান্ত অবস্থায় রয়েছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করলেও এ নিয়ে স্বস্তিতে নেই বিএনপি। ঘোষণার এক মাসে ঢাকা মহানগর কমিটি দৃশ্যমান কিছু করতে না পারলেও উল্টো কয়েক দফা বিশৃঙ্খলা, ব্লেগ গেইম, পরস্পরকে মেনে নিতে না পারার বিষয়টি জনসম্মুখে এসেছে। তবে শিগগিরই ওয়ার্ড ও থানা কমিটি গঠনের কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে কমিটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে সম্প্রতি সংগঠনের বাইরের নেতারা যুবদলে শীর্ষ পদে আসছেন এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার একটি গ্রুপ নয়াপল্টনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর কাছে পৃথকভাবে দেখা করে সংগঠনের ভেতর থেকে কমিটি দেয়ার দাবি জানান। এই দুই নেতা দলের চেয়ারপারসনের কাছে তা তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলন কর্মসূচিসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে রোববার দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন খালেদা জিয়া। পরদিন সোমবার ২০ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে।

এ বিষয়ে কথা বললে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “স্থায়ী কমিটি ও জোটের বৈঠকে কর্মসূচি চূড়ান্ত হবে।” কর্মসূচির ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তারা শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি নিয়েই প্রথমে মাঠে নামবেন। কর্মসূচি চলাকালে কঠোর পথে যাওয়া না-যাওয়া সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করবে।

এর আগে আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, “আন্দোলনের বিকল্প নেই। এবারের আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিএনপি দল-মতনির্বিশেষে সব শ্রেণী-পেশার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলে সরকার পতনের কর্মসূচি দেয়া হবে।”

মির্জা ফখরুল আরো বলেন, “অতীতে ঢাকা মহানগরে আন্দোলনে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। তাই আগামী দিনের আন্দোলনে ঢাকা মহানগরকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।”

এদিকে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে বিএনপি মাঠে নামার আগেই সভা-সমাবেশে সরব হয়ে উঠেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। বিএনপির আন্দোলনের হুমকিকে কটাক্ষ করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম  বলেন, “খালেদা জিয়ার ঈদ বাংলাদেশে আর আসবে না।”

আর খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, “আন্দোলন করার মতো ক্ষমতা তাদের (বিএনপির) নেই। তাদের আন্দোলন ভিডিও কনফারেন্স আর আউটসোর্সিংয়ের আন্দোলন।”
আর বিএনপির আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো মাথাব্যথা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন মাহবুবুল আলম হানিফ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।