বিএনপি-জামায়াত কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না

বেশ কিছু দিন ধরে ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপি বিশ্বাস করতে পারছে না জামায়াতে ইসলামীকে। অন্যদিকে জামায়াতও পারছে না বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের এই দোলাচলে ২০ দলের প্রধান দুটি শরিকের মধ্যে চলছে সম্পর্কের কঠিন টানাপোড়েন।

বুধবার জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড হওয়ায় নতুন করে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। চলছে সন্দেহ-সংশয় ও কানাঘুষা।  ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজে শ্লথগতি এবং জামায়াতের নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘদিন অন্যদের ঘোষিত দণ্ড কার্যকর করার ব্যাপারে সময় নেয়ায় সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। বিএনপি মনে করছে এটা সরকারের সঙ্গে জামায়াতের একটি অর্থপূর্ণ সমঝোতারই ফল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসি কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলার বিচারক পরিবর্তন, সুস্থতার কারণে আদালতের কার্যক্রম স্থগিতকরণ, জামায়াতের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীর জামিন লাভ, আবার জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার দুর্বল অভিযোগপত্র দেয়া এসব কারণে সন্দেহ প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এছাড়াও উপজেলা নির্বাচনে বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। অনেক উপজেলায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান পদ নিয়ে সমঝোতা করেছে। এতে জামায়াত ভাইস চেয়ারম্যান পদে অস্বাভাবিক ফল করেছে। তারা যেসব উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান জিতেছে তার অধিকাংশ উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে জিতেছে আওয়ামী লীগ। বিভিন্ন স্থানে শিবির-ছাত্রদল দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়ছে।  এসব কারণে বিএনপি-জামায়াতের দূরত্বটা আরো বেড়েছে।

শনিবার বিকেলে বিএনপির নির্বাহী কমিটি, যুবদল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কয়েকজন নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, “এখন সময় হয়েছে জামায়াতকে জোট থেকে বের করে দেয়া। দেরি করা হলে বিএনপির জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে। যা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে না।”  এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কেউ অন দা রেকর্ডে কথা বলতে রাজি হননি। তারা বলছেন, “এটি এখন স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু বলা ঠিক হবে না।”

জামায়াতেও বিভিন্ন সময় বিএনপির আচরণে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং তা মিডিয়ায়ও এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে জামায়াত নেতাদের বিচার শুরু হলে দলটি কঠোর আন্দোলন শুরু করে।  জামায়াতের সে কর্মসূচিতে বিএনপির জোরালো সমর্থন না থাকায় জামায়াত-বিএনপির মধ্যে সন্দেহ ও দূরত্ব বাড়তে থাকে। সবশেষ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পর থেকে টিভি টকশোতে বিএনপির যারাই মুখ খুলেছেন তারাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলেছেন, সাঈদীর রায় সরকারের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের ফসল। বিএনপির নেতাদের দেয়া এমন মনোভাব নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে।  নেতাকর্মীর দাবি করছে, “সরকারের সঙ্গে জামায়াতের কোনো আঁতাত হয়নি, হবেও না। বরং বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ আঁতাত করে গ্রেফতার এড়িয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রেখেছেন।”

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মীর নাসির বুধবার রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টক শোতে বলেছেন, সরকার-জামায়াত সমঝোতা হয়ে থাকতে পারে। আরো কয়েক নেতা টক শোতে একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।

জামায়াত নেতারা বলেন, “বিএনপির মধ্যে থাকা জামায়াতবিরোধী কিছু নেতার চেষ্টাই হচ্ছে খালেদা জিয়ার কাছে প্রমাণ করা যে, সরকারের সঙ্গে জামায়াতের গোপন সমঝোতা আছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যদি ‘ঘরের শত্রু বিভীষণদের’ কথা শুনেন তাহলে তাকে পস্তাতে হবে।”

২০ দলীয় জোটের শরিক বিভিন্ন দলের কয়েকজন নেতাদের সঙ্গে কথা বললেও তারা এই সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কথা জানান। তারা বলেন, “জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির আগে থেকেই সন্দেহ ছিল। তাদের নেতাদের বাঁচানোর জন্য সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন-এমন কথা শোনা গিয়েছিল। আবার জামায়াতের মধ্যেও বিএনপিকে নিয়ে অনাস্থা রয়েছে।”

নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক জোটের একজন শীর্ষ নেতা বলেন, “বিএনপির সঙ্গে আগের সেই সুসম্পর্ক নেই এটা একেবারেই নিশ্চিত। তারপরে বিএনপির একটি অংশ চায় জামায়াত জোটে থাকুক, অপর একটি অংশ চায় জামায়াতকে বের করে দেয়া হোক। তাদের যুক্তি, জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন। কর্মসূচি দিলে বলা হয় যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে বিএনপির কর্মসূচি।”
বিএনপি-জামায়াতের দূরত্বে ঈদের পর সরকারবিরোধী যে আন্দোলন রয়েছে তা সফলতার মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে জোটের একাধিক নেতা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে যেভাবে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়ছে তাতে সরকারবিরোধী আন্দোলন সফল হবে কি না জানি না। তারা জামায়াতের জোটে থাকাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।

জামায়াতের মজলিসে শূরার এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটি জোট ভাঙার ষড়যন্ত্র। বিএনপির মধ্যে জামায়াতবিরোধী একটি  গ্রুপ আছে যাদের চেষ্টাই হচ্ছে, খালেদা জিয়ার কাছে প্রমাণ করা যে সরকারের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা আছে। জামায়াত আঁতাতের রাজনীতি করে না। সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে দূরতম সম্পর্কও নেই। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করলে এতো ত্যাগ স্বীকার করতে হতো না, জামায়াত নেতাদের মিথ্যা মামলায় বিচারেই দাঁড় করানো হতো না।”

এ সম্পর্কে ছাত্রশিবিরের সভাপতি আব্দুল জব্বার বলেন, “২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর অনেকে সাঈদী সাহেবের রায়ের পর নতুন করে জল্পনা-কল্পনা শুরু করলেন যে, নিশ্চয় জামায়াতের সঙ্গে সরকারের আঁতাত হয়েছে, নতুবা ফাঁসি থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড! কী করে সম্ভব? তাদের সমালোচনায় মনে হয় এরাও ইসলামবিদ্বেষীদের দোসর।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।