ছাত্রদলের নতুন কমিটি দিয়েও স্বস্তিতে নেই খালেদার

আদুভাই, সন্তানের বাবা না হয় বয়স্ক- এদের হাতেই থাকে ছাত্রদলের দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ থাকলেও এবার যারা সংগঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন তারা আগের তুলনায় কমবয়সী। যদিও অনেকেই ছাত্রত্ব খুইয়েছেন বহু আগে।
এখন দেখার অপেক্ষা খালেদা জিয়ার অনুমোদন দেয়া ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব সরকারবিরোধী আন্দোলনে কী ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ শীর্ষ পদের অনেকেরই গত আন্দোলনে সন্তোষজনক অবদান নেই। অন্যদিকে কমিটি গঠনের পর দিনই পদবঞ্চিতদের ক্ষোভের আগুন জ্বলছে নয়াপল্টন ও গুলশান কার্যালয়ের সামনে। ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে।
ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে নানা সময়ের অপবাদ ঘোচাতে শুরু থেকে কঠোর অবস্থানে ছিলেন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া। সে লক্ষ্যে যোগ্যদের হাতে দায়িত্ব দিতে তিনি গত কমিটির নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় মতবিনিময় করেন। পরামর্শ নেন দল এবং বিএনপিপন্থি পেশাজীবী নেতাদের কাছ থেকে।
কেউ যাতে এলাকাভিত্তিক নেতাদের পদ দিতে না পারে সেদিকেও তার নজর ছিল বলে জানা যায়। এখন প্রশ্ন, আসলেই কি এসব উদ্যোগের সুফল পেয়েছে ছাত্রদল? পদবঞ্চিতদের পাশাপাশি পদ পেয়েছেন এমন নেতারাও একই কথা বলছেন।
মঙ্গলবার রাতে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব আহসানকে সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের ২০১ সদস্যের আংশিক কমিটির অনুমোদন দেন খালেদা জিয়া। অন্য বছরের মতো এবার সুপার ভাইভ কমিটি দেয়া হয়নি।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক সভাপতি ইসহাক সরকার সাংগঠনিক, মামুনুর রশীদ মামুনকে সিনিয়র সহসভাপতি ও আসাদুজ্জামান আসাদকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এছাড়াও ৩৪ জন সহ-সভাপতি, ৩৫ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ২৭ জন সহ-সাধারণ সম্পাদক, ২৮ জন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছাড়াও ১৯ জনকে সম্পাদক পদে মনোনীত করা হয়েছে। বাকি পদ পরে পূরণ করা হবে।
ঘোষিত কমিটির সভাপতি রাজিব আহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। তার সেশন ছিল ১৯৯৫-৯৬ ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সেশন ছিল ১৯৯৭-৯৮। বর্তমানে তারা উভয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মিত ছাত্র। এমফিল করছেন বলে জানা গেছে।
রাজিব আহসানের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ আর আকরামুল হাসানের বাড়ি নরসিংদী। সাবেক সভাপতি আবদুল কাদের ভুইয়া জুয়লের বাড়িও নরসিংদী। এছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মনোনীত ইসহাক সরকারের বাড়ি পুরান ঢাকায়। তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের দক্ষিণেরও সভাপতি। সিনিয়র সহ-সভাপতি মামুনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী। বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানীর বাড়ি লক্ষ্মীপুরে।
শোনা যায়, সাবেক সভাপতি জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক পদ ছেড়ে দেয়ার শর্তে বিএনপির সহ-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দীন টুকু সভাপতির পদে পছন্দের লোক বসিয়েছেন। যিনি কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বর্তমান সভাপতি একসময় টুকুর সঙ্গে রাজনীতি করতেন বলে জানা যায়।চুক্তি অনুযায়ী আকরাম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন।
রাজিবের ব্যাপারে ২০ দলের শরিক বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ তদবির ছিল বলে গুঞ্জন আছে। যদিও বিএনপি নেতারা এ গুঞ্জনের কোনো সত্যতা নেই বলে দাবি করেছেন। এদিকে বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে গত আন্দোলনে ভূমিকা, মার্চ ফর ডেমোক্রেসির জন্য বরাদ্দ করা টাকা আত্মসাত, আওয়ামী পরিবারের সন্তান বলে ছাত্রদল নেতারাই অভিযোগ করছেন।
আর গত কমিটিতে থাকাকালীন কমিটি দেয়ার নাম করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আছে বর্তমান সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। খালেদা জিয়ার মতবিনিময় অনুষ্ঠানে কেউ কেউ এ বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন বলে জানা যায়।
সিনিয়র সহ-সভাপতির বিরুদ্ধে ‌‌‌‌কেউ কেউ শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনলে তিনি এর আগে তা অস্বীকার করেছেন। তিনি শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানীর পছন্দের লোক বলে জোরালোভাবে শোনা যায়। কমিটিতে কোথাও কোথাও সিনিয়রকে জুনিয়রের পরের পদ দেয়া হয়েছে পদ পাওয়া নেতারা এমন অভিযোগও করেছেন।
এদিকে বর্তমান কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পেয়েও সন্তুষ্ট নন ইসহাক সরকার। কারণ তিনি আগের কমিটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি পদে থাকাকালীন শতাধিক মামলার আসামি হয়েছেন। অথচ বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের বিরুদ্ধে হাতে গোনা কয়েকটি মামলা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
সে কারণেই বুধবার রাতে দলের চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভের নেতৃত্ব ছিলেন ইসহাক।এছাড়া সাবেক নেতা এসএম ওবায়দুল হক নাসিরও নেতৃত্বে ছিলেন বলে জানা গেছে। সেখানে ককটেলের বিস্ফোরণও ঘটেছে। সে সময় বিক্ষোভকারীরা ‌এ্যানী-টুকুর কমিটি মানি না, মানবো না। অবৈধ কমিটি মানি না, মানবো না-এসব স্লোগান  দেয়।
এর আগে দুপুরে দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পদবঞ্চিতরা ঝটিকা মিছিল করে। এসময় ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটালে পুলিশ ধাওয়া দেয়। এতে বিক্ষাভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তিনজনকে আটক করে।
সভাপতি পদের প্রত্যাশী ছিলেন ছাত্রদলের এমন একজন নাম না প্রকাশ করার শর্তে নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, ‍“এ্যানী আর টুকু ভাইরা নিজেদের পছন্দমত লোক দিয়ে পকেট কমিটি করেছে।” ওই ছাত্রনেতার প্রশ্ন- যখন এমন কমিটিই হবে তাহলে কেন চেয়ারপারসন দফায় দফায় মতবিনিময় করেছিলেন। নতুন কমিটিতে হয়নি এর কোনো প্রতিফলন হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নতুন কমিটির একজন সহ-সভাপতি নতুন বার্তা ডটকমের  কাছে আন্দোলনে তাদের কমিটি যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা-তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।তিনি বলেন, ভাই এই কমিটি দিয়ে আন্দোলন হবে না।
এদিকে পদ পাওয়ার বুধবার সকালে নতুন সভাপতি সাংবাদিকদের কাছে তাদের ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের সামনে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ। দেশের কঠিন দুঃসময়ে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আমাদের ওপর এক গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন। সেই দায়িত্ব পালন করতে আমরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি।”
আর কমিটি নিয়ে কোন্দলের আশঙ্কা উড়িয়ে তিনি বলেন, ‍‍“সবাইকে বুঝতে হবে চাইলেও খুব বেশিদিন ছাত্রদল করা যায় না। এটা মেনে নিতে হবে।” আর সাধারণ সম্পাদক শিগগিরই ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়সহ সব সাংগঠনিক এলাকায় নতুন কমিটি দেয়া হবে বলে সাংবাদিকদের জানান।
এদিকে পদবঞ্চিতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন কমিটির নেতাদের যাতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঢুকতে না পারে সেজন্য তারা বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নয়াপল্টনে অবস্থান করবেন। পাশাপাশি কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্তদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে তাদের প্রতিহত করার চিন্তাও  রয়েছে বিক্ষু্দ্ধ ছাত্রদল কর্মীদের।
আর বাদপড়া কর্মীদের ক্ষোভের বিষয়ে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী নতুন বার্তা ডটকমকে বলেছেন, “তারুণ্যনির্ভর কমিটি গঠন করতে গিয়ে সাবেক বহু যোগ্য নেতাকে ছাত্রদলের কমিটিতে রাখা সম্ভব হয়নি। যারা বাদ পড়েছেন তাদেরকে বিএনপির অন্যান্য অঙ্গসংগঠনে জায়গা করে দেয়া হবে।”
নতুন কমিটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।