চলমান সঙ্কট নিরসনে সংলাপে বসতে দুই নেত্রীকে চিঠি দিয়েছেন বান কি-মুন

চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সংলাপে বসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিঠি দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীকে বান কি মুন গত ৩০ জানুয়ারি চিঠি লিখেন। এর কয়েক দিন পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠিটি পৌঁছানো হয়। একই সময়ে বিএনপির চেয়ারপারসনকেও চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে তিনি চলমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সঙ্কট নিরসনে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেস তারানকোকে এ বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়েছেন। চিঠিতে মহাসচিব এ ব্যাপারে তারানকোকে সহযোগিতা করার জন্য দুই নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।

 

জানা গেছে, দুই চিঠিতেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বের প্রসঙ্গটি টানেন বান কি-মুন। বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সূচকের পাশাপাশি আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনের প্রশংসা করেন জাতিসংঘের মহাসচিব। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগদানকারী অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের স্বার্থে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জাতিসংঘের আগ্রহের বিষয় বলে বান কি মুন উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের চলমান সহিংসতায় জাতিসংঘের গভীর উদ্বেগের কথা তুলে ধরে নিরপরাধ লোকজন সহিংসতার শিকার হওয়ায় তিনি গভীর উদ্বেগ জানান।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা চিঠিতে বান কি-মুন বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংসদের বাইরের বিরোধী দলকে নিয়ে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানান। চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক উন্নয়নের ব্যাপারে জাতিসংঘ মহাসচিব ব্যক্তিগতভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। তাই সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক (সাবেক) সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে তারানকোকে বাংলাদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন কি না সেটি তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেননি।

 

খালেদা জিয়ার কাছে লেখা চিঠিতে সহিংসতা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন বান কি-মুন। বাংলাদেশে চলমান সমস্যার সমাধানে তিনি তারানকোকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি চিঠিতে উল্লেখ করেন।  ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লেখা এটাই প্রথম চিঠি। অবশ্য নির্বাচনের আগের বছর ২০১৩ সালে তিনি দুই নেত্রীকে সংলাপে বসতে মে ও নভেম্বর মাসে চিঠি লিখেন। আর একই অনুরোধ জানিয়ে দুজনকে ফোন করেন আগস্টে।

 

নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতপার্থক্য দূর করতে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনের দূত হিসেবে তারানকো ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিন দফায় ঢাকায় আসেন। ২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি ছয় দিনের জন্য বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সফরের সময় তিনি দুই দলকে আলোচনার টেবিলে বসালেও তাদের মতপার্থক্য দূর করতে পারেননি। এদিকে, গতকাল নিউইয়র্কে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, বাংলাদেশে জানমালের ক্ষয়ক্ষতিতে মহাসচিব উদ্বিগ্ন। তিনি আন্তরিকভাবে এর শান্তিপূর্ণ সমাধান চান।

 

বাংলাদেশ সরকার চাইছে না তারানকো ঢাকা সফর করুন— বাংলাদেশের কিছু পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এমন খবরের বিষয়ে জানতে চাইলে ফারহান হক বলেন, তারানকোকে আবার ঢাকায় পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই। মহাসচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি শুধু বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং তিনি সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।

 

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি একে আবদুল মোমেন বলেছেন, অস্কার ফার্নান্দেস তারানকো আমাকে জানিয়েছেন যে, তাকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখাশোনার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিব দায়িত্ব দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে তিনি আমার সঙ্গে বৈঠক করতেও চেয়েছেন। আমি বলেছি, অবশ্যই বসে আলাপ করব। দুই নেত্রীর কাছে মহাসচিবের চিঠি সম্পর্কে জানতে চাইলে আবদুল মোমেন বলেন, কিছু একটা পাঠাচ্ছে। এটা আমি এখনও দেখিনি।

 

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফানে দুজারিক ১২ ফেব্রুয়ারি নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংকালে জানিয়েছেন, জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশে সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন। এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় জাতিসংঘ। এ ব্যাপারে মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেস তারানকোকে বাংলাদেশের বিষয়টি দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ সরকার ও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করছেন বলেও জানান দুজারিক।

 

নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর অস্কার ফার্নান্দেস তারানকো যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা উভয়েই বর্তমান সহিংস পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।