দলীয় লিগ্যাল এইডের কি কাজ, প্রশ্ন এখন বিএনপিতেই

হামলা-মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তায় গঠন করা হয় বিএনপি সমর্থিত জাতীয় লিগ্যাল এইড কমিটি। হামলা-মামলা চরমে পৌঁছালেও ঘুম ভাঙেনি কমিটির। লিগ্যাল এইড মূলত কাগজে-কলমে আছে, মাঠে নেই। ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে এটি।

 

মামলায় জর্জরিত অথবা কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দেয়ার কথা এই কমিটির থাকলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। জানা গেছে, নেতাকর্মীরা কিংবা তাদের পরিবার এই কমিটির কাছে আইনি সহায়তার জন্য গেলে, তারা নিষ্ঠুর আচরণ করেন। বেশি টাকা দাবি করেন এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ফিরিয়ে দেন।

 

তবে এই কমিটির ব্যতিক্রম আচরণ দলের শীর্ষ নেতাদের ক্ষেত্রে। তাদের সহযোগিতায় কে কার আগে এগিয়ে যাবেন, এ নিয়ে রীতিমত প্রতিযোগিতা চলে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ক্রমেই বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা আর নির্যাতন বাড়তে থাকে।

 

এমন প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তার জন্য ২০১১ সালে গঠন করা হয় ২১ সদস্যের লিগ্যাল এইড কমিটি। কিন্তু গঠনের পর থেকে আজঅব্দি কমিটির সদস্যদের নিয়ে কোনো বৈঠক হয়নি। বাস্তবে না হলে কাগজে-কলমেও কোনো মনিটরিং সেল করা হয়নি।

 

সারাদেশে নেতাকর্মীদের নামে মামলা ও গ্রেপ্তার বিষয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই কমিটির কাছে। কমিটির সদস্যরা পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়ে থাকেন। এতে করে জাতীয় লিগ্যাল এইড একটি পরিকল্পনাহীন নামমাত্র কমিটিতে পরিণত হয়েছে। খোদ দলের মধ্যেই এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।

 

২০১১ সালের জুন মাসের প্রথম দিকে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনকে প্রধান করে ২১ সদস্যের এই কমিটি করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। হরতালের মাঠে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দলীয় নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দিতেই এই কমিটি করা হয়েছিল।

 

ওইবছরের ১৪ জুন নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘ভিকটিম ও তাদের পরিবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, জেলা কার্যালয়, সুপ্রিমকোর্ট বারসহ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতাদের সঙ্গে কথা বললে, তাদের আইনি সহায়তা দেয়া হবে।’

 

কিন্তু তাদের এই প্রতিশ্রুতি শুধুমাত্র সংবাদ সম্মেলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাগেরহাট থেকে মোহাম্মদ মাসুম নামের এক বিএনপিকর্মী অভিযোগ করে বলেন, ‘বিগত আন্দোলনে আটক নেতাকর্মীদের জামিনের জন্য তারা নিজেদের পকেট থেকে চাঁদা দিয়ে আইনজীবী নিয়োগ করেছেন।

 

দলের লিগ্যাল এইড কমিটির সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ করে কোনো কাজেই আসেনি।’ সদ্য কারামুক্ত বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের তুলনায় নিরপেক্ষ আইনজীবীদের কাছে টাকার বিনমিয়ে ভালো সহায়তা পাওয়া যায়।’

 

তিনি বলেন, ‘ভুক্তভোগী নেতাকর্মীরা দলীয় আইনজীবীদের কাছে শরণাপন্ন হলে তারা রুঢ় আচরণ করেন। বেশি টাকা হাকিয়ে বসে থাকেন। এজন্য দ্বিতীয়বার তাদের কাছে যেতে কারো মন টানে না।’ সংশ্লিষ্টরা জানায়, আটক নেতাকর্মীদের মধ্যে ছাত্রদলের জন্য অনেকটা আইনি সহায়তা সহজ হলেও অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থা ভয়াবহ।

 

এছাড়া ঢাকার বাইরের অনেক নেতাকর্মী পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা পান না। অনেকটা অভিভাবকহীন অবস্থায় তারা কারাগারে অবস্থান করছেন। কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দল কিংবা সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

 

এসব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপিপন্থি এক আইনজীবী আরটিএনএন- কে বলেন, ‘বিএনপিতে এখন টেলিভিশনের ক্যামেরায় মুখ দেখানোর প্রতিযোগিতা চলে। আইনজীবীদের কারো নেতাকর্মীদের মামলা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। দলের শীর্ষ নেতাদের তারা সন্তষ্ট রাখতেই পারলেই কাজ হাসিল সহজ হয়।’

 

আইনজীবী সমিটির সভাপতি-সম্পাদকের নাম উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘বিএনপির আন্দোলন শুরু হওয়ার পর রাত পোহালেই তারা দলের চেয়ারপারসনের কাছে ছুঁটে যাবেন রাজনৈতিক দর্শন দেয়ার জন্য।’ ‘যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তারা সারাদেশের নেতাকর্মীদের সহযোগিতা করলে আন্দোলনে এত কর্মী সংকট হত না। নেতাকর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হয়েও দলের কোনো সহায়তা পান না, এজন্য তারা আন্দোলন বিমুখ হয়ে উঠছেন।’ মনে করেন এই বিএনপিপন্থি আইনজীবী।

 

কমিটির সদস্য সুপ্রিমকোর্টের এক আইনজীবী বিষয়টি স্বীকার করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাব ছিল জুনিয়র আইনজীবী দিয়ে এই কমিটি করার। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসন সিনিয়রদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করেন।’

 

তিনি বলেন, ‘সিনিয়ররা কেন্দ্রীয় নেতাদের মামলায় তৎপর থাকেন। জুনিয়ররা আশাহত হয়ে সিনিয়রদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। এতে করে আজ পর্যন্ত এই কমিটি নেতাকর্মীদের দৃশ্যমান কোনো আইনি সহযোগিতার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।’

 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া। তিনি বলেন, ‘দল থেকে সব নেতাকর্মীকেই প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেয়া হচ্ছে। দেশের প্রতিটি জায়গায় এই সহায়তার সুযোগ রাখা হয়েছে।’

 

তবে যারা দলের জন্য যত বেশি নিবেদিত, তারা তত বেশি আইনি সহায়তা পেয়ে থাকেন বলে জানান সানাউল্লাহ মিয়া। তবে দলের জন্য নিবেদিত কোনো মাপকাঠিতে নির্ধারণ করা হয়, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।