নজিরবিহীন সহিংসতায় শেষ হলো ইউপি নির্বাচন, আ.লীগের জয়জয়কার

নজিরবিহীন সহিংসতা ও রেকর্ড সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির মধ্যে দিয়ে কার্যত শেষ হলো নবম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। দেশে প্রথমবারের মত দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তরের এই নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু হয় গত ২২ মার্চ। এরপর ছয়টি ধাপে ভোট গ্রহণ করা হয়। শনিবার ছিল শেষ ধাপে ৬৯৮টি ইউপিতে ভোট।

 

এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ইউপিতে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। এখনো বেশ কিছু ইউপির নির্বাচন বাকি রয়েছে, যেগুলোতে পরবর্তীতে ভোট গ্রহণ করা হবে। ব্যাপক সহিংসতাপূর্ণ ষষ্ঠ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও বিপুল জয়ের পথে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আগের পাঁচ দফা নির্বাচনেও বিশাল জয় পেয়েছিল ক্ষমতাসীন দলটি।

 

এর আগের পাঁচ ধাপে চেয়ারম্যান পদে নৌকার প্রার্থীরা ২২৬৭ ইউপিতে ও ধানের শীষের প্রার্থীরা ৩১০ ইউপিতে জয়ী হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে চেয়ারম্যান হয়েছেন ৬৯৬ জন।

 

ইসির হিসাবে প্রথম ধাপে ৭৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ৭৮ শতাংশ, তৃতীয় ধাপে ৭৬ শতাংশ, চতুর্থ ধাপে ৭৭ শতাংশ ও পঞ্চম ধাপে ৭৬.৮ শতাংশ ভোট পড়েছে।

 

প্রথম পাঁচ দফার মতই ষষ্ঠ ধাপেও ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে অন্তত ৩৫ জন প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছে, যাদের বড় অংশই বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে অন্তত ৩৬ টি কেন্দ্রের।

 

ষষ্ঠ ধাপের নির্বাচনে শনিবার সহিংসতায় অন্তত ৪ জন নিহত এবং গুলিবিদ্ধসহ শতাধিক লোক আহত হয়েছে। শনিবার অনুষ্ঠিত ৬৯৮টি ইউপি নির্বাচনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬১৭টির বেসরকারি ফল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ ৩৫৮টি, বিএনপি ৬০টি ও অন্যরা ১৯৯টিতে জয়ী হয়েছে।

 

ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে সহিংসতায় অন্তত ১১৩ জনের বেশি লোক নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষ

 

প্রাণহানি আর বিনা ভোটে জয়ের রেকর্ড

প্রাণহানি আর বিনা ভোটে জয়ের দিক থেকে এবারের ইউপি নির্বাচন আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ‘ব্যাপক সহিংসতাসহ বিভিন্ন ধরনের নির্বাচনী অনিয়মের কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সবচেয়ে মন্দ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন’ বলে মন্তব্য করেছেন সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)।

 

গত ২৬ মে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন নিয়ে কাজ করা সুজন জানায়, ইউপি নির্বাচনে ১৯৭৩, ১৯৭৭, ১৯৮৩ ও ১৯৯২-এ প্রাণহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ১৯৮৮ সালে ৮০ জন, ১৯৯৭ সালে ৩১ জন, ২০০৩ সালে ২৩ জন এবং ২০১১ সালে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানা যায়।

 

অতীতের নির্বাচনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ১৯৮৮ সালে। সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনের তকমাও জুটেছিল ঐ নির্বাচনের নামের পাশে।

 

প্রাণহানির ক্ষেত্রেও অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছে এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং তা চলছে দীর্ঘমেয়াদীভাবে।

 

সুজন জানায়, ২৫ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী বা সমর্থক ৪০ জন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ১২ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ২ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি’র ১ জন, জনসংহতি সমিতির ১ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ২ জন, মেম্বার প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থক ৩১ জন এবং ১২ জন সাধারণ মানুষ রয়েছেন প্রাণহানির তালিকায়।

 

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রেও এবার রেকর্ড তৈরি হয়েছে।

চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার অতীতের যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সে অনুযায়ী ১৯৮৮ সালে ১০০ জন,  ১৯৯২ সালে ৪ জন, ১৯৯৭ সালে ৩৭ জন এবং ২০০৩ সালে ৩৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

এক্ষেত্রেও ১০০ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের নিয়ে ১৯৮৮ সাল ছিল এগিয়ে। তবে অতীতের সকল রেকর্ড ম্লান হয়ে গিয়েছে এবারের নির্বাচনে।

 

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এই সংখ্যা ২২০। প্রথম ধাপে ৫৪ জন, দ্বিতীয় ধাপে ৩৪ জন, তৃতীয় ধাপে ২৯ জন, চতুর্থ ধাপে ৩৪ জন, পঞ্চম ধাপে ৪৪ জন এবং ষষ্ঠ ধাপে এ পর্যন্ত ২৫ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। এরা সকলেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।