জঙ্গিবাদ ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য অনিশ্চিত

বেশ কিছুদিন থেকেই রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি আলোচিত হয়ে আসছে। বিএনপি নেতারা এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্যের দাবিও তুলেছে। সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐক্য গড়ার দাবি উঠে জোরালোভাবে। এ নিয়ে তাদের তৎপরতাও লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু তাদের এ দাবি আমলে নেয়নি সরকার। এতে রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

 

আওয়ামী নেতারা জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি নানা শর্তে আবদ্ধ করেছেন। এমনকি জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে বিএনপির নেতারা হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

 

এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রস্তাবিত জাতীয় ঐক্য নিয়ে দলটির নেতাদের আগ্রহ থাকলেও এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়নি। কারণ সরকার পক্ষে সাড়া না পাওয়ায় ঐক্যের প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত দলগুলোর সঙ্গে কথা বলার জন্য খালেদা জিয়া এ পর্যন্ত কাউকে দায়িত্ব দেননি।

 

পক্ষান্তরে কার্যত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী বিএনপির এই জাতীয় ঐক্যের ডাক আমলে নেয়নি সরকার। বরং এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির সমালোচনাই করেছেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা।

 

খালেদার জাতীয় ঐক্যের আহ্বানের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য ‘ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়ে গেছে’।

 

গত ১৭ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনি কি মনে করেন না যে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এখন জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়ে গেছে? আমিতো মনে করি জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়ে গেছে।’

 

সেই সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যারা ‘পুড়িয়ে মানুষ মারে, অথবা যুদ্ধাপরাধ করে’, তাদের ‘কথা আলাদা’। ‘যাদের ঐক্য হলে সত্যিকারভাবে সন্ত্রাস দূর করা যাবে, তাদের ঐক্য কিন্তু ঠিকই গড়ে উঠেছে এবং এই ঐক্য থাকবে। এটা হল বাস্তব,’।

 

নাম উল্লেখ না করে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সাপ হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়া’ আর চলবে না।

 

জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বিএনপি জাতির সঙ্গে তামাশা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। গত ১৪ জুলাই সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

 

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের খারাপ লাগে, যারা সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে লিপ্ত, তারা আজ জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়, মূলত তারা জাতির সঙ্গে তামাশা করেছে।’

 

এদিকে বিএনপি ক্ষমতা হারিয়ে দেশবিরোধী নানা ষড়ষন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহাজান খান।

 

গত শনিবার সকালে চট্টগ্রামে শহীদ মো. ফজলুর রহমান মুন্সি অডিটোরিয়ামে এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, যারা জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন, তারা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। জঙ্গিবাদ লেলিয়ে দিয়ে দেশে জাতীয় ঐক্য হবে না।

 

এতো কিছু্র মাঝেও বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রস্তাবিত জাতীয় ঐক্যের আহ্বান প্রসঙ্গে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেই আগ্রহী হয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও এরই মধ্যে মতবিনিময় করেছেন।

 

যতদূর জানা গেছে তাতে, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেও সরকার দলীয় ১৪ দলের আওতাভুক্ত দলগুলো থেকে তেমন সাড়া পাননি ডা. জাফরুল্লাহ।

 

গত ২০ জুলাই রাতে ডা. জাফরুল্লাহ বৈঠক করেন সিপিবির তিন নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মঞ্জুরুল আহসান খান ও হায়দার আকবর খান রনোর সঙ্গে। এর আগের দিন তিনি বৈঠক করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে। মঙ্গলবার তিনি বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলেন।

 

এসব তৎপরতার মাঝে কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও হঠাৎ বৃহস্পতিবার বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অর্থ পাচারের এক মামলায় ৭ বছরের জেল ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

 

এর পরেই মূলত রাজনীতির মাঠে অনেকটা ফিঁকে হতে দেখা যায় জাতীয় ঐক্যের ডাক।

 

বিএনপির জাতীয় ঐক্যের ডাক আড়াল করতেই, অর্থপাচার মামলায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রায় দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন বিএনপির অনেক নেতা। সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকা মহানগর বিএনপির প্রতিবাদ সভায় এমন অভিযোগ করেন বিএনপির নেতারা।

 

বক্তারা অভিযোগ করেন, বিরোধী দলকে নির্মূলের অংশ হিসেবে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ রায় দেয়া হয়েছে।

 

এদিকে  প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য জাতিকে বিভক্ত করবে। তার এ ধরনের বক্তব্য জাতির কাছে স্পষ্ট করা দরকার। তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে জাতি ঐক্যবদ্ধ না হয়ে বরং আরো বিভক্ত হবে। কেননা জাতীয় ঐক্য হয় সংগঠনের ভিত্তিতে।

 

তিনি বলেন, আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্য বলতে শুধু জনগণের সমর্থনকে বুঝিয়েছেন। হ্যাঁ, এদেশের ১৬ কোটি মানুষ এই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সমর্থন দিয়েছে কিন্তু জনগণকে বাদ দিয়ে, জনগণকে সংগঠিত না করে কখনো জাতীয় ঐক্য হতে পারে না।

 

এ ছাড়া জাতীয় ঐক্যে প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় আপত্তি জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে। যদিও ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে জামায়াতের সাথে ঐক্যেবদ্ধ আন্দোলন করেছিলে আওয়ামী লীগ।

 

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। তারা দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সত্যিকারের জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ২৪ জুলাই এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এ আহ্বান জানান।

 

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইংরেজি দৈনিক নিউজ টুডে’র সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, জঙ্গি দমন করতে হবে সে ব্যাপারে সবার মধ্যে উদ্দেশ্যের দিক থেকে একটা ঐক্য হয়ে গেছে।

 

কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্যের সম্ভাবনা কতটা যেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে?

 

তিনি মনে করছেন, বাংলাদেশে যে বিভাজনের রাজনীতি তা অত্যন্ত বিষাক্ত একটা অবস্থায় চলে গেছে। তাতে প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য হবে কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

 

প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্যের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন, তুরস্কে এরদোগানের বিরোধীরাও যখন বলছে তারা সামরিক অভ্যুত্থান মানেন না- সেটাকে বলা যায় প্রাতিষ্ঠানিক জাতীয় ঐক্য। বা ভারতের কাশ্মীরে কোন সমস্যা দেখা দিলে সব দল একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নেয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।