জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাত বছরের দণ্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাত বছরের দণ্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রবিবার এ আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আবেদনকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার নওশাদ জমির। এর আগে গত ২৯ অক্টোবর পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের ৭ নম্বর কক্ষে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত–৫ এর বিচারক মো. আখতারুজ্জামান জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত।

একই সঙ্গে তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সাজা হয়েছে মামলার অপর তিন আসামিরও।

খালেদা জিয়ার পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত অপর তিনজন হলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতেই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচবছর কারাদণ্ড পেয়ে বন্দি রয়েছেন খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে আপিলের পর হাইকোর্টে যা বেড়ে ১০ বছর হয়। হারিছ চৌধুরী রয়েছেন পলাতক।

অপর দুই আসামি দীর্ঘদিন জামিনে থাকলেও সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মুন্না ও মনিরুলকেও কারাগারে পাঠানো হয়।

চারজনের বিরুদ্ধে দণ্ড ঘোষণার পাশাপাশি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের টাকায় খালেদা জিয়ার নামে কাকরাইলে কেনা ৪২ কাঠা জমি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেন আদালত।

২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা করা হয়। এ ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে মামলাটি করে দুদক।

তদন্ত শেষে ২০১২ সালে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হলে দুদকের পক্ষে এই মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।

তবে শুনানি চলাকালে খালেদা জিয়া একাধিকবার আদালতে হাজির হতে অনিচ্ছা দেখান।

সবশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বরও তিনি আদালতে হাজির না হওয়ায় তাকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেন বিচারক; একই সঙ্গে খালেদার অনুপস্থিতিতে বিচারিক কার্যক্রম চলবে বলে আদেশ দেন। এর বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া হাইকোর্টে আবেদন করলে ১৪ অক্টোবর সেটি খারিজ হয়ে যায়।

হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন খালেদা জিয়া। পরে ২৯ অক্টোবর তাকে ৭ বছরের দণ্ড দেন বিচারিক আদালত।

আপিল আবেদনে ২০টি গ্রাউন্ডের উল্লেখ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১১টি গ্রাউন্ড হলো—
১. জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট একটি প্রাইভেট ট্রাস্ট। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় খালেদা জিয়া হস্তক্ষেপ করেননি এবং এ মামলায় ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন প্রযোজ্য নয়।

২. জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট নামে হিসাব খোলার আবেদন ফর্মে খালেদা জিয়ার সই থাকলেও তার পদবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ নেই কিংবা তার প্রধানমন্ত্রী পদবীর কোনও সিল নেই। এই ট্রাস্টের কোনও হিসাবেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার নাম উল্লেখ নেই। এই ট্রাস্ট তিনি তার ব্যক্তিগত ক্ষমতাবলে পরিচালিত করতেন।

৩. এই মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে উপযুক্ত কোনও তথ্যপ্রমাণ ছিল না। এই মামলায় তাকে ধারণার ওপর নির্ভর করে অভিযুক্ত এবং সাজা প্রদান করা হয়েছে।

৪. রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা চ্যারিটেবল ট্রাস্টের ফান্ডে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে।

৫. ডা. ফারজানা আহমেদ নামের এক নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে মামলার অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাকে এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাক্ষী বা তার কোনও লিখিত বক্তব্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি।

৬. দুদক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং পক্ষপাতমূলকভাবে এ মামলার অভিযোগের অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, যা রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীর বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

৭. কারাগারের ভেতরে স্থাপিত আদালতে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে এ মামলার বিচারকার্য পরিচালনা, সাজা ও দণ্ড প্রদান করা হয়েছে, যা বেআইনি।

৮. জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যক্তিগত ট্রাস্ট্র, যা ট্রাস্ট আইন ১৮৮২ দ্বারা পরিচালিত হবে। তাই এর বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষমতা দুদকের নেই।

৯. মামলার এক কোটি ৩৫ লাখ টাকার পে অর্ডার সম্পর্কিত বিচারিক আদালতের অনুসন্ধানটি মামলার মূল নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

১০. মামলার দালিলিক প্রমাণ ও রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য এটা প্রমাণ করে যে, মেট্রো মেকার অ্যান্ড ডেভেলপার্স লিমিটেড মামলা সংশ্লিষ্ট পাঁচটি পে অর্ডারের আবেদন করেছিল।

১১. মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, মেট্রো মেকারস অ্যান্ড ডেভেলপার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পাঁচটি পে অর্ডার সম্পর্কিত বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য।

এছাড়া আপিল আবেদনের বাকি নয়টি গ্রাউন্ড মামলা পরিচালনার স্বার্থে প্রকাশ করতে নারাজি জানান ব্যারিস্টার নওশাদ জমির। তিনি বলেন, ‘মামলাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মামলা পরিচালনার স্বার্থে অবশিষ্ট গ্রাউন্ডগুলো এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’