বিতর্কিতদের মনোনয়নে দোষ দেখছে না বড় দুই দল আ’লীগ-বিএনপি

এবারের সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েকটি মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি যাদের বিরুদ্ধে দলীয় নেতা-কর্মীদেরও অভিযোগ আছে, তারাও মনোনয়ন পেয়েছেন। কিন্তু দুদলই তাদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছে।

এবারের নির্বাচনেও সবচেয়ে আলোচিত কক্সবাজারের বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি। ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে তার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। তাই কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের বদি এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। কিন্তু তার বদলে পেয়েছেন তার স্ত্রী শাহীন আখতার। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, ‘যেই লাউ, সেই কদু’। খবর ডয়ে চেভেলের।

আর টাঙ্গাইল-৩ আসনে মনোনয়ন পাননি আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য আমানুর রহমান রানা। রানা আওয়ামী লীগেরই এক নেতাকে হত্যার দায়ে এখন কারাগারে। কিন্তু তাতে কী? আওয়ামী লীগ এই আসনে মনোনয়ন দিয়েছে রানার বাবা আতাউর রহমান খানকে। তাতে এলাকার মানুষ বিস্মিত এবং ক্ষুব্ধ।

বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ সম্ভূর বিরুদ্ধে এক হয়েছিলেন জেলার প্রায় সব আওয়ামী লীগ নেতা। তাদের অভিযোগ– তিনি দুর্নীতিবাজ। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছেও অভিযোগ করেছেন। তারপরও সম্ভূ মনোনয়ন পেয়েছেন।

একই ধরনের অভিযোগ ছিল বরিশাল-৪ (মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা) আসনের সংসদ সদস্য পঙ্কজ দেবনাথের বিরুদ্ধে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা তাকে মনোনয়ন না দেয়ার দাবিতে গণভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন। তারপরও পঙ্কজ দেবনাথের মনোনয়ন ঠেকানো যায়নি।

এরকম আরো যারা বিতর্কিত অথচ মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন শাজাহান খান, শামসুর রহমান খান ডিলু, নিজাম উদ্দিন হাজারী, শওকত হাচানুর রহমান, এ কে এম শামীম ওসমান, শেখ আফিল উদ্দিন, রণজিত কুমার রায়, আ স ম ফিরোজ, ফাহমি গোলন্দাজ, ওমর চৌধুরী, মনোরঞ্জন শীল, আবদুল ওয়াদুদ দারা, দবিরুল ইসলাম। দুর্নীতি, নির্যাতন ছাড়াও এদের কারো কারো বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর দখলের অভিযোগও আছে।

এসব প্রার্থী সম্পর্কে নিয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘আমরা যাচাই-বাছাই করেই প্রার্থী দিয়েছি। যেসব অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে তা তো আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত নয়। আর কেউ খারাপ হলে তার স্ত্রী বা পিতা খারাপ হবেন, তা তো বলা যায় না। তাই যদি হয়, তাহলে তারেক রহমান তো দণ্ডিত। তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান তো নির্বাচন করতে আসতে চেয়েছিলেন। অনেকেই তো তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।’

প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় এরকম হয়। নির্বাচন শুরু হয়ে গেলে এসব থাকবে না।’

এদিকে বিএনপির বিতর্কিত প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনায় একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আবদুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীমও রয়েছেন। তাকে জয়পুরহাট-১ আসনের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। হালে আলোচনায় এসেছেন আওয়ামী লীগ ছেড়ে সদ্য বিএনপিতে যোগ দেয়া সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। তাকে পটুয়াখালী-৩ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং সাংবাদিক পেটানোর অভিযোগ আছে।

সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আমিনুল হক, সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী রহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং সাবেক সাংসদ নাদিম মোস্তফার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়া নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। তারা রাজশাহী অঞ্চলের। তাদের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে ওই অঞ্চলে জেএমবি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতার অভিযোগ আছে।

এছাড়া ওয়ান ইলেভেনের সময় সংস্কারপন্থি বলে পরিচিতি পাওয়াদের মধ্যে আবু হেনা (রাজশাহী-৪), আলমগীর কবির (নওগাঁ-৬), জহিরউদ্দিন স্বপন (বরিশাল-১), সাখাওয়াত হোসেন বকুল (নরসিংদী-৪) এবং শহীদুল হক জামালকেও (বরিশাল-২) মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

পিরোজপুর-১ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে আছেন মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর পুত্র শামীম সাঈদী। তিনি জামায়াতের প্রার্থী। তাকে ধানের শীষ প্রতীক দেয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে বিএনপি। এছাড়া যুদ্ধপরাধের কারণে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর ভাই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও মনোনয়ন দিয়েছে দলটি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান খান দুদু বলেন, ‘আমরা জয়ের লক্ষ্যে প্রার্থী দিয়েছি। এখন জনগণই বিবেচনা করবে। আর মামলা থাকলেই অপরাধী নয়। সেটা আদালতে প্রমাণ হতে হয়। যাদের বাংলাভাই ও জেএমবির সহযোগী বলা হয়, তাদের বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ সত্য নয়। আমরা যখন ক্ষমতায়, তখনই বাংলা ভাই, শায়েখ রহমানদের গ্রেপ্তার করে বিচার করেছি। অন্যরা স্লোগান দিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে কেউ দণ্ডিত হলে তার সন্তান তো তার জন্য দায়ী নয়। তাদের তো দণ্ড হয়নি। সাঈদীর পুত্র জামায়াত করেন। জামায়াত তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। জামায়াত ২০ দলীয় জোটে আছে। জোট ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছে। তাই সাঈদীর পুত্র ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছন।’

দুই দলেই বিতর্কিত প্রার্থীদের এই মনোনয়ন নিয়ে ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স (ফেমা)-র চেয়ারম্যান মুনিরা খান বলেন, ‘আমরা যাদের বিতর্কিত বলছি, তারা কীভাবে বিতর্কিত। তারা তো আদালতে দণ্ডিত হননি। আর এক জনের অপরাধের জন্য তো তার পরিবারের সদস্যদের দায়ী করা যায় না। এটা করা হলে তাদের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনে দলগুলো তাদের পছন্দমতো প্রার্থী নির্বাচন করে। তারা জয়ের জন্য প্রার্থী নির্ধারণ করে।’