অলৌকিকত্ব কারো মর্যাদার মাপকাটি নয়

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ভূমিকাঃ- ধর্ম এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের প্রতি ভালবাসা এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি স্বাভাবিক ভাবেই প্রায় প্রত্যেক মানুষের মধ্যে রয়েছে। এটা অবশ্যই ভালো কথা কিন্তু আমাদের সমাজের এক শ্রেনীর মানুষের ধারনা যে, যত বেশী অলৌকিকত্ব দেখাতে পারবে সে তত বেশী মর্যাদাবান আল্লাহ পাকের বেশী প্রিয় এবং সে মানুষের ভালবাসা পাওয়ার অধিকার রােেখ বেশি এমনকি কোন কোন মানুষ তার কথা এবং কাজকে ইসলামের দলীল হিসাবে গ্রহণ করে। কিন্তু প্রকৃত কথা হলো অলৌকিকত্ব যতি মর্যাদার মাপকাটি হবে তাহলে সবচেয়ে বেশী অলৌকিকত্ব দেখাতে পারে শয়তান। সে মূহুর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে পারে । সে মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করতে পারে। আসল কথা হলো মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে।
অলৌকিকত্ব কি?
অলৌকিকত্ব বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো স্বাভাবিকভাবে যে কাজ করা বা করানো, স্বাভাবিক পদ্ধতিতে মানুষের জন্য যেটা সম্ভব নয়। যা অতি প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয় তাকে অলৌকিকত্ব বলে।
অলৌকিকত্বের শ্রেণী বিভাগঃ- অলৌকিকত্বকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি।
১.    কুদরাত ঃ- আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তিনি এমন এক সত্তা যিনি সকল প্রকার দুর্বলতা এবং অক্ষমতা থেকে পবিত্র। যেমন মিরাজ সম্পর্কে আল্লাহ পাক সূরা বনী ইসরাইলে বলেছেন,

الْأَقْصَى الْمَسْجِدِ إِلَى الْحَرَامِ الْمَسْجِدِ مِّنَ لَيْلًا بِعَبْدِهِ أَسْرَىٰالَّذِي سُبْحَانَ
অর্থঃ তিনিই সেই সত্তা যিনি রাতের একাংশে তার বান্দাহকে ভ্রমন করিয়েছেন, সমজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসার দিকে (আয়াত-১),
তিনি যে আছেন তার ক্ষমতা যে পৃথিবীর সকল ক্ষমতার উৎস একথা প্রমান করার জন্য আল্লাহ পাক বিভিন্ন সময়ে কোন মাধ্যম ছাড়া কিছু অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত করান, যা আমাদের কাছে আল্লাহর কুদরাত নামে পরিচিত। যেমন, রাসুল (সঃ) এর মেরাজ যা কেবল মহান আল্লাহর পক্ষেই সম্ভব। আদ, সামুদ জাতির ধ্বংস, প্লাবনের মাধ্যমে নূহ (আঃ) এর জাতিকে ডুবিয়ে মারা।
ফেরাউনের লাশকে না পচিয়ে মানুষের জন্য নিদর্শন হিসাবে রাখা, আইলা আর সিডরের মাধ্যমে এলাকার পর এলাকা ধ্বংস করা ইত্যাদি।
অতএব, অলৌকিকত্বের প্রথম ধাপ হচ্ছে, এই কুদরাত যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর ক্ষমতা ও শক্তি সম্পর্কে জানতে পারি।
২.    মুজিযাহঃ- মুজিযাহ সম্পূর্নরুপে আম্বিয়া কেরামগণের সাথে সম্পৃক্ত মুজিযাহ হলো আল্লাহ তায়ালা নবীগণের (আঃ) নবুওয়াত শক্তিশালী ও প্রমাণিত করার জন্য যে সকল অস্বাভাবিক ও অলৌকিক বিষয় ও ঘটনা নবীদের মাধ্যমে প্রকাশ করেন তাকে মুজিযাহ বলে।
ইতিহাস পর্যলোচনা করলে দেখা যাবে যে, যে যুগে যে স্থানে নবী প্রেরণ করেছেন। সে যুগে বা সে স্থানে সবচেয়ে যে বিষয়টি আকর্ষনীয় ও সবচেয়ে আলোচিত। সেই ধরনের  অথচ সেই জিনিস নয় এমন কিছুকে মুজিমাহ হিসাবে প্রেরণ করেছেন। হযরত দাউদ (আঃ) যে যুগে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন । সে যুগের মানুষ সবচেয়ে পারদর্শী ছিলো লোহা দিয়ে বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র তৈরীতে  । লোহা আগুনে দিয়ে পিটিয়ে সেটাকে আকাবাকা করে তারা রকমারী অস্ত্র তৈরি করতো। এবার দেখুন হযরত দাউদ (আঃ) এর মুজিযাহ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কি বলেছেন।

شَاكِرُونَ أَنتُمْ فَهَلْ ۖبَأْسِكُمْ مِّن لِتُحْصِنَكُم لَّكُمْ لَبُوسٍ صَنْعَةَ وَعَلَّمْنَاهُ

অর্থঃ এবং আমি তাকে {দাউদ (আঃ)}  লোহ বর্ম নির্মাণ কৌশল শিখিয়েছি কল্যাণের জন্য যেন যুদ্ধে তা তোমাদেরকে আঘাত থেকে রক্ষা করে তবুও কি তোমরা কৃতজ্ঞ হবে না ?। (সুরা আম্বিয়া -৮০)

হযরত সুলাইমান (আঃ) এর মুজিযাহ সম্পর্কে আল্লাহর বক্তব্য শুনুন।
ولسليمان الريح غدوها  شهرو رواحها شهر واسلناله عين القطر ومن الجن من يعمل بين يديه باذن ربه ومن يزغ منهم عن امرنا نذقه من عذاب السعيرا يعملون له ما يشاء من محاريب وتماثيل وجفان كالجواب وقدوررسيت اعملواال دود شكرا وقليل من عبادى الشكور

অর্থঃ আর সুলাইমানের জন্য আমি বাতাশকে বশীভূত করে দিয়েছি। সকালে তার চলা এক মাসের পথ পর্যন্ত এবং সন্ধায় তার চলা এক মাসের পথ পর্যন্ত আমি তার জন্য গলিত তামার প্র¯্রাবণ প্রবাহিত করি। এবং এমন সব জিনকে তার অধীন করে দিয়েছি । যারা তাদের রবের হুকুমে তার সামনে কাজ করতো তাদের মধ্য থেকে যে আমার হুকুমে অমান্য করে তাকে আমি আস্বাদন করাই জ্বলন্ত আগুনের স্বাদ । তারা তার জন্য তৈরী করত যা কিছু সে চাইত। উচু উচু ইমারত, ছবি, বড় বড় পুকুর সদৃশ থালা এবং অনড় বৃহদাকার ডেগ সমূহ। (সূরা সাবা-১২-১৩)।

হযরত মুসা (আঃ) এর যুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় । সে সময়ে শয়তানী মন্ত্র নামে পরচিত যাদু এত বেশি বিস্তৃতি লাভ করেছিলো । যে পৃথিবীর অন্য কোন যাদুর প্রভাব লক্ষ করা যায়না । সে যুগের মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তায়ালা নবী হিসাবে প্রেরণ করলেন মুসা (আঃ) কে। মুসা (আঃ) কে মুজিমাহ হিসাবে আল্লাহ দিলেন একটি লাঠি। এটা যাদু নয়, বরং মাদুর থেকেও শক্তিশালী একটি বিশাল মুজিমাহ।

যে লাঠি ফেলে দিলে সাপ হয়ে যেত এবং সাপ ধরলে লাঠি হয়ে যেত। ফেরাউন যখন যাদুকরদের ভরসায় মুসা(আঃ) কে চ্যালেঞ্জ করেছিল সে সময় আল্লাহ তায়ালা বলেছিল হে সূসা তোমার ডান হাতে ওটা কি? তিনি বললেন ইহা একটি লাঠি, যা দিয়ে আমার ছাগলের পাতা পাড়ি এবং অন্যান্য কাজ করি। মূসা(আঃ) লাঠি ফেলে দিলে তা জিবন্ত সাপে পরিণত হলো। যখন সে সাপ ধরল তখন তার পূর্বের অবস্থায়  ফিরে গেল(আল কোরআন)

হযরত ঈসা(আঃ) এর সময়কে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সে সময়ের মানুষ চিকিৎসা বিদ্যায় পারদশী ছিলো প্রাচীন অনেক চিকিৎসক, ঈসা (আঃ)এর সময়কার । ঈসা (আঃ) এর মুজিমাহ হলো। তিনি মৃত মানুষকে জিবিত করতে পারতেন। কুষ্ট রোগীকে ভাল করতে পারতেন। অন্ধের চোখে হাত বুলালে অন্ধের অন্ধত্ব দূর হয়ে যেত।

আমাদের নবী প্রিয় নবী (সঃ) এর সময়কে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেই সময়ের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশী আকর্ষণীয় এবং অলোচিত বিষয়  ছিলো কাব্য, কবিতা, এবং কবিগণ। আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদ (সঃ) কে নবী হিসাবে প্রেরণ করে সবচেয়ে বড় যে মুজিযাহ দিলেন তাহলো মহা বিশ্বের মহা বিস্ময়, মহাগ্রন্থ আল কোরআন। আর কোরআন সম্পর্কে যার সামান্যতম জ্ঞান আছে। তিনি যানেন সমগ্র কোরআনকে আল্লাহ পাক কাব্যিক আকারে পেশ করেছেন অথচ সেটা কোন কবিতার বই নয়। প্রিয় পাঠক লক্ষ করুণ আল্লাহ তায়ালা অলৌকিত্ব দিয়ে নবীদের মর্যাদা নির্ধারণ করেন নি। খৃীষ্টান মিশনারীগণ তাদের ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় পোষ্টার মেরে সেখানে লিখেছে। মুহাম্মাদ (সঃ) এর থেকে ঈসা মসীহ বড়, কারণ ঈসা (আঃ) বীনা পিতায় জন্ম গ্রহণ করেছে। তিনি অন্ধের অন্ধত্ব দূর করতে পারতেন ইত্যাদি। ঈসা (আঃ)কে আল্লাহ তায়ালা উক্ত মুজিযাহ গুলো দিয়েছিলেন কারণ ওই সময়কার মানুষের হেদায়েতের জন্য উক্ত মুজিযাহ গুলো প্রয়োজন ছিলো। আর একটি বিষয় লক্ষ করুণ ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ তায়ালা উক্ত মুজিযাহ গুলো দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি কতজন মানুষকে হেদায়েত করতে সক্ষম হয়েছিলেন ? প্রচলিত বাইবেল অনুযায়ী আমরা বলতে পারি ঈসা (আঃ) অনেক অন্ধর অন্ধত্ব দূর করতে পেরেছেন ঠিকই, কিন্তু অনেক পথহারা মানুষকে পথ দেখাতে পারেননি।

তার মাত্র বারো জন শিষ্য ছিলো তাদের ইমান এত দুর্বল ছিলো যে, তাকে যখন গ্রেফতার করা হয়েছিলো তখন একজন বিশ্বাস ঘাতকতা করে এবং অপরজন অস্বীকার করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ বিশ্ব নবীকে অনেক অলৌকিকত্ব প্রদান করেছিলেন এবং তার মাধ্যমে আল্লাহ লক্ষ লক্ষ পথহারা মানুষকে পথের দিশা দিয়ে ছিলেন।

কারামত ঃ- কারামাত শব্দটি নবীগণ ছাড়া আল্লাহর যে কোন প্রিয় বান্দার সাথে সম্পৃক্ত । যারা আমাদের সমাজে ওলী বলে পরিচিত। ওলীগণের কারামত সত্য এ ব্যাপারে পৃথিবীর সকল আলিম একমত পোষণ করেছেন। তাদের বক্তব্য হলোঃ- كرمات الاولياء حق
৩.    অর্থ্যাৎ ওলীগণের কারামত সত্য।

তবে শব্দটি কুরআন ও হাসীসের কোন পরিভাষা নয়। হিজরী দ্বিতীয় শতকে মুসলীম আলিমগণের পরিভাষায়  নবী ও রাসুলদের আয়াতকে মুজিযাহ এবং ওলীগণের আয়তকে কারামত বলা হয়। তবে মনে রাখতে হবে মুজিযার মত কারামতও কারো মর্যাদার মাপ কাঠি নয়।

কারামত এটা এমন নয় যে আল্লাহ তাআলা কারো চিরস্থায়ী ভাবে প্রদান করে থাকেন। বরং সময় বিশেষ ইসলামের প্রয়োজনুসারে তার কোন প্রিয় বান্দার মাধ্যমে কারামত প্রকাশ করেন। যেমন ২৩ হিজরীর প্রথম দিকে এক শুক্রবারে উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) মসজিদে নববীতে খুতবা প্রদান কালে উচ্চঃস্বরে বলে উঠলেন, يا سارية الجبل
হে সারিয়া পাহাড়ে যাও। সেই সময় সাবিয়া ইবনু যুনাইম নামে এক মুসলীম সেনাপতি পারস্যের এক যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করছিলেন । তিনি যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি উমরের এই কথা শুনে পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধে জয়লাভ করে ছিলেন।

অপরদিকে এই বছরেরই শেষের দিকে ২৩ হিজরীর যিলহজ্ব মাসের ২৭ তারিখে ফজরের সালাত আদায়ের জন্য যখন তিনি তাকবিরে তাহরীমা বলেন । তখন তারই পেছনে মুসল্লিরুপে চাদর গায়ে দাড়িয়ে থাকা আল্লাহর শত্রু আবু লুলূ লুকানো ছুরি দিয়ে তাকে বারংবার আঘাত করে। তিনি অচেতন হয়ে পড়ে যান, চেতনা ফেরার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমাকে কে আঘাত করলো। তাকে বলা হলো আবু লূলূ তিনি বললেন আল হামদুলিল্লাহ আমাকে কোন মুসলীমের হাতে শহীদ হতে হলোনা। এর কয়েক দিন পর তিনি শহীদ হলেন।

প্রিয় পাঠক লক্ষ করুণ হাজার হাজার মাইল দূরে সারিয়াকে দেখে তিনি সতর্ক করলেন অথচ তার পেছনে ছুরি নিয়ে দাড়িয়ে ঘাতক আবু লূলূকে দেখতে পেলেননা।

হাঃ মোঃ ইসমাইল হোসেন
কালীগঞ্জ ঝিনাইদহ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।