বাজিমাত করলেন কক্সবাজারের দিদার বলী

পাতানো খেলার অভিযোগে দু’বছর আগে আব্দুল জব্বারের বলিখেলায় নিষিদ্ধ হয়েছিলেন তারকা বলী কক্সবাজারের রামুর দিদার। আবেদন করে ভুল স্বীকার করে এ বছর খেলায় ফিরেন তিনি। ফিরেই বাজিমাৎ করেছেন দিদার। গতবারের চ্যাম্পিয়ন অলি বলীকে মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে পরাস্ত করে প্রমাণ করে দেন দিদার অপ্রতিদ্বন্দ্বী। একইসঙ্গে আব্দুল জব্বারের বলিখেলায় দিদার বলী দশমবারের মত বিজয়ের পদক নিয়ে যান নিজের ঘরে। এর আগে তিনবার দিদার বলী যুগ্মভাবে এবং ছয়বার এককভাবে শিরোপা অর্জন করেছিলেন।
নগরীর লালদিঘীর মাঠে বানানো অস্থায়ী মঞ্চে বালির স্তরের উপর বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে শুরু হয় বলিখেলা। মাঠজুড়ে, আশপাশের ভবনের ছাদে বসে খেলা উপভোগ করা হাজার হাজার দর্শকের মধ্যে ছিল টান টান উত্তেজনা আর কৌতুহল। চীৎকার, চেঁচামেচি আর ঢোলবাদ্য বাদনে লালদিঘীর মাঠ জুড়ে ভিন্ন আবহের সৃষ্টি হয়। খেলার প্রথম রাউন্ডে অংশ নেন ৮০ জন প্রতিযোগী। সেখান থেকে ৪০ জনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। সেমিফাইনালে অংশ নেন ৬ জন প্রতিযোগী। এরা হলেন, কক্সবাজারের রামুর দিদার বলী, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার বাঞ্চারামপুরের অলি বলী, মিরসরাইয়ের লিয়াকত বলি, রাউজানের ইকবাল বলি, পতেঙ্গার ইউনূস এবং রামুর মনজুর বলি। সেমিফাইনাল শুরুর পর প্রথমে মিরসরাইয়ের লিয়াকত আর রাউজানের ইকবাল মুখোমুখি হন। লিয়াকত ইকবালকে হারিয়ে মুখোমুখি হন দিদার বলীর। দিদার তাকে মাত্র এক মিনিটে কুপোকাত করলে মাঠ থেকে বিদায় নেন লিয়াকত।
অন্যদিকে সেমিফাইনালে রামুর মনজুর এবং পতেঙ্গার ইউনূসের সঙ্গে। ইউনূসকে হারিয়ে মনজুর মুখোমুখি হন অলি বলীর। বেশ কিছুক্ষণ শারিরীক কসরতের পর অলি মনজুরকে পরাস্ত করতে সমর্থ হন। সেমিফাইনালের দু’অংশে দু’জন বিজয়ী দিদার বলী ও অলি বলী ৫টা ১৪ মিনিটে ফাইনাল রাউন্ডে পর¯পরের মুখোমুখি হন। শুরুর এক মিনিটের মধ্যেই দিদার অলি বলীকে শূন্যে তুলে আছড়ে ফেলেন বালির উপর। কিন্তু শারীরিক কসরতে কম নন অলিও। মুহুর্তেই উঠে ঝাপটে ধরেন দিদারকে। মুহুর্তের জন্য অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যেন কেহ কারে নাহি ছাঁড়ে সমানে সমান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিন মিনিটের মাথায় অলিকে পরাস্ত করে দিদার জিতে নেন ১০৪ তম আসরের শিরোপা।
বিজয়ী দিদারের হাতে মেলা কমিটির পক্ষ থেকে নগদ ১৫ হাজার টাকা এবং ট্রফি তুলে দেন মেয়র এম মনজুর আলম। রানার্স আপ অলি বলীর হাতে দেয়া হয় ১০ হাজার টাকা ও ট্রফি। এছাড়া পহেলা বৈশাখে সিআরবি শিরিষতলায় বলীখেলার প্রবক্তা মো.সাহাবউদ্দিন নিজের পক্ষ থেকে দু’হাজার ও এক হাজার টাকা পুরস্কৃত করেন। এদিকে দর্শকদের পাশাপাশি মঞ্চে বসে খেলা উপভোগ করেন সিটি মেয়র এম মনজুর আলম, সিএমপি কমিশনার মো.শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বনজ কুমার মজুমদার ও একেএম শহীদুর রহমান, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ স¤পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন, বাংলালিংকের রিজিওনাল কমার্শিয়াল হেড মো.ফরহাদ হোসেন, বলিখেলা ও বৈশাখী মেলা কমিটির সভাপতি জহরলাল হাজারীসহ অতিথিরা। এর আগে বেলুন উড়িয়ে বলিখেলার ১০৪ তম আসরের উদ্বোধন করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। অনুষ্ঠানের শুরুতে রাজধানী ঢাকার সাভারে ভবন ধসে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মেয়র বলেন, ‘আবদুল জব্বারের বলিখেলা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এ ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতেও ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করব।’ বলীখেলা পরিচালনা করেন চট্টগ্রামের ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর এম এ মালেক। আয়োজক কমিটির সভাপতি জহর লাল হাজারী জানান, এবছর বলী খেলায় অংশ নেয়ার জন্য ৮৬জন প্রতিযোগী নাম নিবন্ধন করেছিলেন। সবাই খেলায় অংশ নিয়েছেন।
প্রথম রাউন্ডে বিজয়ী ৪০ জন
বলিখেলার প্রথম রাউন্ডে মোট ৮০ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। এর মধ্যে বিজয়ী ৪০ জন হলেন, কক্সবাজারের মহেশখালীর বজল করিম, কুমিল্লার মোহাম্মদ আলম ও মানিক, সাতকানিয়ার বেলাল ও লালু বলি, চট্টগ্রামের পতেঙ্গার ইসমাইল, মহেশখালীর হাশেম, কুমিল্লার মোহাম্মদ আলী, শিকলবাহার এমাজ উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাবলু, বোয়ালখালীর কাঞ্চন, ফিরিঙ্গিবাজারের নান্টু, কুমিল্লার রতন, পতেঙ্গার জাকির, মহেশখালীর রবি, কুমিল্লার শফিউল্লাহ, হাটহাজারীর জসীম, মহেশখালীর নেছার ও রাসেল, মিরসরাইয়ের সবুজ, গোপালগঞ্জের মো.জেহাদ, বোয়ালখালীর সোহেল, কুমিল্লার খোকন, সীতাকুন্ডের মাঈনউদ্দিন, নগরীর কোতয়ালীর হাশেম, কক্সবাজারের উখিয়ার জয়নাল আবেদিন, কক্সবাজারের রাশেদ, নগরীর এনায়েতবাজারের মো.সুমন ও ইয়াকুবনগরের যুবরাজ, মহেশখালীর রশিদ, গঙ্গাবাড়ির তুফান দাশ, কুমিল্লার সবুজ ও বাদশা, নীলফামারির নারায়ণ রায়, রাউজানের আব্দুল আজিজ, গোপালগঞ্জের মিনহাজ, পতেঙ্গার খাজা আহমেদ এবং হাটহাজারীর মফিজ। মেলা কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী প্রথ রাউন্ডে বিজয়ী ৪০ জনের হাতে ট্রফি তুলে দেন।
২০১০ সালে পাতানো খেলার অভিযোগে নিষিদ্ধ হওয়ায় গত দু’বার অংশ নিতে পারেননি দুই তারকা বলী দিদারুল আলম ও মর্ম সিং ত্রিপুরা। তারা পরপর দু’বার এবং সর্বমোট ছয়বার যুগ্ম চ্যা¤িপয়ন হয়ে চট্টগ্রামে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী আব্দুল জব্বারের বলীখেলায় রেকর্ড গড়েছিলেন। নিষিদ্ধ হওয়ার পর মর্ম সিং বলীখেলা ছেড়ে দিয়েছেন। জব্বারের বলী খেলাকে ঘিরে লালদিঘী ময়দান ও আশপাশের প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসেছে গ্রামীণ লোকজ মেলা। আবদুল জব্বার স্মৃতি কুস্তি প্রতিযোগিতা ও বৈশাখী মেলা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত বলী খেলা এবছর ১০৪তম বছরে পদার্পণ করছে।
প্রসঙ্গত, ১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দেশের যুব সমাজকে সংগঠিত করার জন্য এ বলী খেলার প্রচলন করেছিলেন চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার। এর পর থেকে প্রতিবছরই লালদীঘিতে এ খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।