আর্জেন্টিনা হট ফেবারিট

প্রথম বিশ্বকাপেই ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা৷ খেলা হচ্ছিল উরুগুয়েতে, ফলে, আর্জেন্টিনার বহু ফুটবলপ্রেমী দলে দলে খেলা দেখতে চলে এসেছিল৷ এমনও বেশ কিছু মানুষ এসেছিল যাদের আবেগ জন্ম দিয়েছে এবং ক্রমাগত গভীর করেছে ফুটবলপ্রেম, অথচ তারা পেশাগতভাবে বা অভ্যাসগতভাবে নানা দুষ্কর্ম করে বেড়ায়৷ এরকমই এক পাগল আর্জেন্টিনীয় সমর্থক খেলার আগে উরুগুয়ের স্ট্রাইকার মাইকেল ক্যাস্ট্রোকে টেলিফোনে মেরে ফেলার হুমকি দেয়৷ বলে, উরুগুয়ে যদি ম্যাচটা জিতে যায় তা হলে নাকি ক্যাস্ট্রো আর কোনো দিন সূর্যাস্ত দেখতে পাবে না৷ আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উন্মাদনা আজও একই রকম আছে, হয়ত বা কিছুটা বেড়েছেও৷ সেবার ফাইনালে উঠেও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি তারা৷ তার পরেও দীর্ঘ দিন বিশ্বকাপ জেতা তো দূরস্হান, ফাইনাল খেলার যোগ্যতাও অর্জন করতে পারেনি আর্জেন্টিনা৷

অবশেষে ১৯৭৮ সালে নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায় এবং দু’বছর আগে থেকেই জাতীয় দলের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয় লুই সিজার মিনোত্তিকে৷ মারিও কেম্পেস আর লুকে ছিল সেবার আর্জেন্টিনার গোল অস্ত্র৷ কিন্তু ফাইনালে উঠে তাদের সামনে পড়ে বিশ্বকে নতুন ফুটবল-স্টাইল উপহারদাতা নেদারল্যান্ডস অর্থাৎ হল্যান্ড. ’৭৪-এর বিশ্বকাপেই হল্যান্ডের ‘টোটাল ফুটবল’ দেখে চমকে গিয়েছিল পৃথিবী, কিন্তু সেবার ফাইনালে জার্মানির মাটিতে জার্মানির কাছে হেরে বিশ্বকাপ তাদের হাতছাড়া হয়৷

জোহান ত্রু্কয়েফের হল্যান্ড বা বলা যায় রাইনুস মিশেলের হল্যান্ডের কাছে বিশ্বকাপ এর পরও অধরাই রয়ে গেল৷ কারণ, ’৭৮ সালের ফাইনালে হঠাৎই কুড়ি মিনিটের জন্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে মারিও কেম্পেস আর পর পর দু’গোল করে বসে৷ আর্জেন্টিনার দীর্ঘ দিনের অপেক্ষার অবসান হয়৷

’৭৮ সালে দল তৈরি করার সময় আর্জেন্টিনার কোচ মিনোত্তি এক অনন্য ফুটবল প্রতিভার সন্ধান পান, তাকে জাতীয় দলে প্রায় নিয়েই নিয়েছিলেন৷ কিন্তু শেষ পর্যম্ত বয়স একেবারেই কম বলে তাকে দলে নিতে চাননি মিনোত্তি৷ সেই ফুটবল প্রতিভা পরের বিশ্বকাপে স্পেনে আত্মপ্রকাশ করে এবং সারা বিশ্বকে বিস্ময়ে মুগ্ধ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়৷ তার পরের বিশ্বকাপে মেক্সিকোয় আর্জেন্টিনার সেই বিস্ময়বালক তারুণ্যপ্রাপ্ত হয়ে, আরও পরিণত হয়ে ফুটবলবিশ্বে আবির্ভূত হয়৷ সবাইকে বুঝিয়ে দেয়, নেহাতই এক ফুটবলার নয়, নীল-সাদা জার্সি পরে এসে গেছে বাস্তবিকই এক ফুটবল-জাদুকর৷ বলাই বাহুল্য, ’৮৬ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা৷

ব্রাজিল তো সেই তিরিশের দশক থেকেই প্রতিভাবান ফুটবলারের জন্ম দিয়ে আসছে৷ সেই লিওনিদাস থেকে শুরু করে পেলে-গ্যারিঞ্চা, জিকো-সক্রেটিস, রোমারিও-রোনাল্ডো হয়ে আজকের নেইমার পর্যন্ত, এ যেন ব্রাজিলের ফুটবলসমুদ্রে প্রতিভার নিরন্তর ঢেউয়ের মতো৷

কিন্তু, আর্জেন্টিনা দীর্ঘ পাঁচ দশকের চেষ্টার পর সেই সমুদ্র মন্থন করে অমৃত তুলে নিয়ে এলো- দিয়াগো ম্যারডোনা৷ এই অমৃতের স্বাদ চেটেপুটে যখন বিশ্বের ফুটবলপ্রেমী দেবতারা উপভোগ করতে চাইছে, ঠিক তখনই অসুরদের হামলা, ’৯৪-এর বিশ্বকাপ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে৷ শুরু হলো মারাদোনা নামের সেই অমৃত নিয়ে দেবতা আর অসুরকুলের যুদ্ধ! ডোপ টেস্ট পজিটিভ বেরোল ম্যারডোনার৷ সেই লড়াইয়ের টানাটানিতে অমৃত শেষ হওয়ার আগে চলকে পড়ল তিন ভাগ হয়ে ব্রাজিল, ফ্রান্স আর আর্জেন্টিনায়৷ বিশ্ব ফুটবলে জন্ম হলো জিনেদিন জিদান, রোনাল্ডিনহো আর লাওনেল মেসির৷

দু’দশক পরে তাই আবার বিশ্বকাপে ‘হট ফেবারিট’ আর্জেন্টিনা৷ লাওনেল মেসি ফুটবল থেকে শুধু যে যশ, প্রতিপত্তি অর্জন করেছে তা-ই নয়, পেয়েছে অসংখ্য পুরস্কার৷ বিশ্বের ফুটবলে ক্লাব স্তরে এমন কোনো পুরস্কার নেই, যা মেসি পায়নি৷ কিন্তু গত দু’বারের আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের সোনার পদক আজও তার ট্রফি-ক্যাবিনেটকে অলঙ্কৃত করতে পারেনি৷ এবার মেসি তাই মরিয়া, মেসির প্রিয় সহ-খেলোয়াড়রাও মরিয়া এবং অবশ্যই মরিয়া কোচ সাবেয়া৷

আর্জেন্টিনা দলের গোলে এবার আরও পরিণত সের্গিও রোমেরো৷ ডিফেন্সে ডেমিচেলিস, জাবালেতা, ওটামেন্ডির মতো অভিজ্ঞদের সঙ্গে আছে তরুণ গ্যারে, ফার্নান্ডেজরা৷ কোচ সাবেয়া নিশ্চয়ই চান, তার মূল সেনাপতি মেসি সামনে থেকে বুক চিতিয়ে দলকে চালনা করুক, বিপক্ষের কাছে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠুক৷ তার জন্য অত্যন্ত জরুরি দলের মাঝমাঠকে সচল রাখা৷ যে সব কোচকে নিয়ে মিডিয়া হইচই করা পছন্দ করে, তাদের মধ্যে অন্যতম গুয়ারদিওলা৷ এই কোচের একটা অভ্যেস আছে, নিজের উপস্হিতি জানান দেওয়ার জন্য দলের একজন নামী প্লেয়ারের পজিশন বদলে দেন৷ বায়ার্নে যেমন এখন লাম-কে সাইড ব্যাক থেকে তুলে মাঝমাঠে খেলাচ্ছেন, তেমনই মাসচেরানোকে মাঝমাঠ থেকে স্টপারে নামিয়ে বার্সিলোনা ডিফেন্সের বারোটা বাজিয়েছিলেন৷ লাম জার্মানি দলে সাইড ব্যাকেই খেলছে, আর্জেন্টিনার মাঝমাঠেও মাসচেরানো থাকবে৷ সঙ্গে থাকবে ম্যাক্সি রডরিগেজ, ডিমারিয়া, সোসা, গ্যাগো, এনজো পেরেজ– কোচের হাতে অনেক ‘অপশন’৷ ফরোয়ার্ডেও মেসির সঙ্গ দেওয়ার জন্য যোগ্য সঙ্গী আছে একাধিক৷ আগুয়েরো আর লাভেজ্জি তো আছেই, আরও আছে হিগুয়েন আর প্যালাসিও৷ আহতের তালিকা শূন্য, সবাই আছে ভাল ফর্মে৷ ফলে, এবার বিশ্বকাপে বেশি সংখ্যক ম্যাচ তাদের খেলতে হবে বলে মনে হচ্ছে৷ ডিফেন্সে কিছুটা বয়সের ভার থাকলেও বাকি জায়গাগুলো সমর্থকদের কাছে উৎসাহব্যঞ্জক৷

গ্রুপে এবারও তাদের সঙ্গে নাইজেরিয়া, যারা বেগ দিয়ে থাকে আর্জেন্টিনাকে৷ যদিও এবার প্রথম ম্যাচ তাদের সঙ্গে নয়, তবু বসনিয়া-হার্জেগোভিনা প্রথম ম্যাচে যে বেগ দেবে না, এমন কথা বলা যায় না৷ দলে একাধিক ম্যাচ উইনার আছে বলে আর্জেন্টিনার অসুবিধা হবে না বলেই মনে হয়৷ প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালও আর্জেন্টিনার কাছে খুব কঠিন হয়ত হবে না৷ বিশ্বকাপ বহুবারই হিসাব উল্টে যেতে দেখেছে৷ যদি তা না হয়, হিসাব যদি ঠিকঠাক থাকে, তা হলে কোয়ার্টার ফাইনালেই আর্জেন্টিনা-পর্তুগাল অর্থাৎ মেসি-রোনাল্ডো মুখোমুখি হয়ে যেতে পারে৷ সেমিফাইনালে উঠলেও আর্জেন্টিনাকে ব্রাজিলের মুখে পড়তে হচ্ছে না (অবশ্য যদি ব্রাজিল ফাইনালে ওঠে)৷ ফাইনাল যদি ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে হয়, তা হলে আবার ’৫০ সালের আতঙ্ক ব্রাজিলকে তাড়া করতে পারে৷ ফলে, এই বিশ্বকাপ থেকে ট্রফি নিয়ে দেশে ফেরার একটা সুযোগ লাওনেল মেসির কাছে আছে৷ এ সত্যও হয়তো অস্বীকার করা যাবে না যে, তার হাতে সম্ভবত এটাই শেষ সুযোগ৷ – ওয়েবসাইট।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।