পাহাড় খেকোদের কালোথাবা লাল মাটির পাহাড়ে - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

পাহাড় খেকোদের কালোথাবা লাল মাটির পাহাড়ে



মো. খায়রুল ইসলাম, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের পাহাড়িয়া এলাকায় অবাধে চলছে লাল মাটির টিলা কাটার মহোৎসব। আর পাহাড় ও টিলা কাটা মাটি বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটা মালিকদের কাছে। ভরাট করা হচ্ছে পুকুর ও নিচু জমি। বিভিন্ন ফসল ও সবজি আবাদের নাম করে এবং বাড়ি ঘর নির্মাণের কথা বলে ২০/৩০ ফুট উচু টিলা কেটে মাটির শ্রেনি পরিবর্তন করে সমতল করা হচ্ছে। বনবিভাগের সংরক্ষিত ভূমিতে ভ্যেকু বা এস্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটার মহোৎসব চললেও বনবিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের এ নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই। এভাবে পাহাড় কাটার ফলে পরিবেশ বির্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।


পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৬ (খ) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করতে পারবে না। তবে অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় বা টিলা কাটা যেতে পারে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদন্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে।


আবার ২০১৬ সালের ভূমি ব্যবহার আইন অনুযায়ী ‘যেসব জমি বনভূমি হিসেবে টিলা, পাহাড় শ্রেণি, জলাভূমি, চা বাগান, ফলের বাগান, রাবার বাগান ও বিশেষ ধরনের বাগান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে তার শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। এসব স্থানে কোনো ধরনের আবাসিক কিংবা শিল্প-কারখানা স্থাপন করা যাবে না। এ আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সশ্রম কারাদÐ ও সর্বনি¤œ ১ বছরের সশ্রম কারাদÐ এবং ৫০ লাখ টাকা অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে অপরাধ দমনে জরুরি প্রয়োজনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারবে। অথচ সারা বছর ধরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা অবাধে দিনরাত পাহাড় ও টিলা কেটে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করলেও প্রশাসনের নজর নেই সেদিকে।


সরেজমিনে উপজেলার পাহাড়িয়া এলাকার সাতটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ এলাকায় দেখাযাবে পাহাড় ও টিলা কাটার চিহ্ন। উপজেলার জুগিয়াটেংগর, মাকরাই, ঘোড়ামারা, পাঞ্জাচালা, হরিণাচালা, তেঘড়ি, সন্ধানপুর ইউনিয়নের পাড়বাহুলী, চৌরাশা, মাইধারচালা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফসল ও সবজি আবাদের নাম করে পাহাড় ও টিলা কেটে সমতল ভূমি বানানো হচ্ছে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির মাটি ব্যবসায়ীরা মাসের পর মাস ভ্যেকু দিয়ে পাহাড় ও টিলার লাল মাটি কেটে আশপাশের ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি করছে এবং পুকুর ও নিচু ভূমি ভরাটের কাজে ব্যবহার করছে। কেউ কেউ আবার টিলা কেটে সমতল ভূমি তৈরি করে বাড়ি নির্মাণ করছে। আবার কেউ মাছ চাষের জন্য পাহাড় কেটে পুকুর তৈরি করছে। পুকুর কাটার এসব মাটি তারা পাহাড় খেকোদের কাছে বিক্রি করছে। এক কথায় পাহাড় খেকোদের কালো থাবায় লাল মাটির পাহাড় এখন বিপন্ন হওয়ার পথে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মোঃ আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, বছরের পর বছর যেভাবে পাহাড় কাটা চলছে তা অব্যাহত থাকলে জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়বে পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাবে। বৈচিত্রময় লাল মাটির পাহাড় এক সময় তার ঐতিহ্য হারিয়ে বিপন্ন হয়ে পড়বে। বনবিভাগের কর্তাদের সামনে পাহাড় বা টিলা লালমাটি বিক্রি করলেও তারা নিশ্চুপ। বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বনবিভাগের উঁচু পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।


ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নে জুগিয়াটেংগর গ্রামের আবুবকর মিয়া, আবুল হোসেন ও তার ভাই নুরুল ইসলাম প্রায় তিন একর ভূমির দুটি বড় পাহাড়ের গাছ ও পাহাড় কেটে ইতোমধ্যে বিক্রি করেছেন। ফলে ওই এলাকা এখন অনেকটাই সমতল ও পুকুরে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে আবুল হোসেন ও নুরুল ইসলাম নুরু জানান, টিলা হলেও জমিটি তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। নিজেদের প্রয়োজনের তাদের রোপনকৃত গাছ কেটে মাটি বিক্রি করেছেন।


ধলাপাড়া রেঞ্জকর্মকর্তা এস এম হাবিবুল্লাহ জানান, পাহাড় কাটার আইনী কোন বৈধতা নেই সেটা হউক বনবিভাগের জমি হউক রেকর্ডের জমি। পাহাড় কাটা বন্ধে দ্রæত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।


উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারি কমিশনার ( ভূমি) মোছা. নুর নাহার বেগম জানান, পাহাড় কাটা ও মাটি কেটে জমির শ্রেনি পরিবর্তনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর