‘স্কাইপ ষড়যন্ত্র’ ঘটনা ঘটা সরকারেরই ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ:আইন প্রতিমন্ত্রী

ঢাকা, ১৬ ডিসেম্বর (খবর তরঙ্গ ডটকম)- আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতির স্কাইপ-কথোপকথন সংবাদপত্রে ফাঁস হওয়ার ঘটনাকে একটি ষড়যন্ত্রের ফলাফল বলে মনে করেন। ঢাকায় বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপ অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করে মি. ইসলাম স্বীকার করেন, এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সরকার যথেষ্ট সচেতন থাকা সত্ত্বেও এমন একটি ঘটনা ঘটা সরকারেরই ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।এবারের বাংলাদেশ সংলাপে প্যানেল আলোচক হিসেবে মি. ইসলাম ছাড়াও ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট খন্দকার মাহবুব হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তুরিন আফরোজ।

দর্শকদের পক্ষ থেকে করা প্রথম প্রশ্ন ছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চেয়ারম্যানের কথিত কথোপকথন ফাঁস হওয়াতে এই বিচার কার্যক্রম কি প্রশ্নবিদ্ধ হবে?

এই প্রশ্নে প্যানেল আলোচক ও উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়। বিএনপি নেতা মি. হোসেন আইন প্রতিমন্ত্রীর উল্লেখ করা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব উড়িয়ে দেন।

মি. হোসেন বলেন, ‘কিসের ষড়যন্ত্র? মাননীয় বিচারপতি মাত্র ১৭ ঘণ্টা কথা বলেছেন। ২৩০ টি ই-মেইল করেছেন। এই মামলায় কখন কি আদেশ দিতে হবে, পরামর্শ নিয়ে আদেশ দিয়েছেন। এরপরেও যদি কেউ ষড়যন্ত্র করে থাকে তবে সরকারই তা করেছে। যাতে এই বিচার প্রক্রিয়াটা আরও বিলম্বিত হয়, আরেকবার যাতে বলবার সুযোগ হয় যে যুদ্ধাপরাধীদের আমরা বিচার করবো আরেকবার সুযোগ দিন।’

তবে বিচার কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হবে কিনা এই প্রশ্নে মি. ইসলাম, মি. হোসেন এবং মিজ আফরোজ একমত হন যে, এতে বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।

শুধু খন্দকার মাহবুব হোসেন উল্লেখ করেন, এই কথোপকথন ফাঁস এবং এর প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট বিচারপতির পদত্যাগের ঘটনা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের, বিশেষ করে ট্রাইব্যুনালের, ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।

আর অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, এতে চলমান যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্যক্রম এরই মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। বিচারপতি পদত্যাগ করায় প্রশ্নবিদ্ধ হবার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

এদিকে, আইন প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে হ্যাকিং একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। সেই বিচারে স্কাইপ হ্যাকিং করে কথোপকথন ফাঁস যে বা যারা করেছে তারা আইন ভেঙেছে। এখন ঘটনা কারা ঘটাল তা আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘এমনভাবে তারা ষড়যন্ত্র করেছে, সেটা আমরা ধরতে পারিনি, আমি বলবো এটা আমাদের ব্যর্থতা।’

‘ষড়যন্ত্র নিয়ে প্রথম থেকেই সচেতন ছিলাম আমরা। সচেতনতার কোনও অভাব ছিল না। তারপরও ষড়যন্ত্রকারীরা ভেতরে অনুপ্রবেশ করেছে। কারা এটা করেছে সেটা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

‘ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করেই আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবো। ক্ষমতায় আসার জন্য নয়,’ মন্তব্য করেন আইন প্রতিমন্ত্রী।

সম্প্রতি স্কাইপের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া এই আলোচনার কোনও বিষয়বস্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করার উপর একটি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত।

এমনই এক প্রেক্ষাপটে আরেকজন প্রশ্নকর্তা জানতে চান, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন কতটা যুক্তিসঙ্গত?

এই প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক তুরিন আফরোজ বলেন, ‘ব্যক্তির যে স্বাধীনতা রয়েছে সেটিকে কোনোভাবেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নামে হরণ করা যায় না, যদি না সেখানটিতে জনস্বার্থ জড়িত থাকে।’

তবে তিনি একই সাথে বলেন, ‘এটি খুব সূক্ষ্ম একটি জায়গা, আমাদেরকে সেখানটাতে বিচার করে দেখতে হয় যে, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইস্যুটি ঠিক কোন জায়গায় শেষ হচ্ছে আর কোন জায়গা থেকে জনস্বার্থ শুরু হচ্ছে।’

তিনি মনে করেন, স্কাইপের আলোচনায়, যে তথ্য গিয়েছে সেটা জন-গুরুত্বপূর্ণ এইজন্য নয় যে, তাতে রায় কোনদিকে যাচ্ছে সেটা কোনোভাবে উল্লেখ করা নেই।

তবে তুরিন আফরোজের বক্তব্যে ভিন্নমত জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম।

তিনি এখানে বলছেন, ‘এই বিচার কার্যক্রম, অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের বিচার একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুতরাং জাতীয় জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের যেকোনো কিছু সংবাদপত্র প্রকাশ করার অধিকার রাখে।’

এই প্রসঙ্গে দর্শকদের মধ্যে থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া উঠে আসে। একজন দর্শক মন্তব্য করেন, ‘কথোপকথনের আলোচ্য বিষয় সংবাদপত্রে উঠে আসা ঠিক হয়নি। এটা একটা খারাপ অনুশীলন।’

আরেকজন দর্শক বলেন, ‘সংবাদপত্র এটা প্রকাশ করে সাধারণ জনগণকে বিষয়টি জানার সুযোগ করে দিয়েছে। সংবাদপত্রের এটা প্রকাশ করা উচিত।’

আর বিএনপি নেতা খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রশ্ন তোলেন, ‘এটা প্রকাশ করা বন্ধ করে দিলেন কেন?’

তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান, এটা প্রকাশ করে প্রমাণ করে দিন যে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ না।

‘এটা বন্ধ করে দিয়েই জনমনে সন্দেহ এনে দেয়া হয়েছে যে, কি জানি কি আছে ওর ভেতরে,’ বলেন মি. হোসেন।

আইন প্রতিমন্ত্রী এর জবাবে বলেন, ‘একটা মামলা হয়েছে এবং উচ্চ আদালত একটি রুল জারি করে এটা প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এখানে সরকারের তরফ থেকে কোনও পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।’

সংলাপে আরও নানা বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে; দর্শকরা জানতে চান সম্প্রতি বিরোধী দলের একটি কর্মসূচিতে বিশ্বজিৎ নামে একজন সাধারণ নাগরিককে কুপিয়ে হত্যা করবার ঘটনার বিচার হবে কিনা?

এ সময়ে দর্শকদের কেউ কেউ তাদের মন্তব্যে এই বিচারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।

একজন দর্শক বলেন, ‘ইতিহাস তাই বলে যে, এইরকম হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে আমরা খুব বেশী পারঙ্গম নই। এই বিচারও যে হবে না এব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত।’

তবে আইন প্রতিমন্ত্রী মি. ইসলাম এই ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে বলেন, শনিবারই ওই হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত শাকিলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

‘এ ব্যাপারে সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিচার অবশ্যই হবে এবং দ্রুত বিচার আইনে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে এদের বিচার হবে, আমি নিশ্চিন্ত। একেবারে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি,’ তিনি বলেন।

সংলাপে হরতাল প্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, জনপ্রতিনিধিরা কি সত্যিই জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করেন?

এই প্রশ্নে খন্দকার মাহবুব হোসেন হরতালকে একটি সংস্কৃতিগত অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করে সরকারি দলকে আহ্বান জানান, এমন কোনও ইস্যু সৃষ্টি না করতে যাতে হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি দিতে হয়। আর কামরুল ইসলাম এখনকার প্রেক্ষাপটে হরতালকে একটি ‘ভোঁতা হাতিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেন।

(বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপের সঞ্চালক ছিলেন আকবর হোসেন। আর এটি প্রযোজনা করেছেন ওয়ালিউর রহমান মিরাজ।)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।