পাশ্চাত্য ও রাশিয়ার শীতলযুদ্ধ

লন্ডন: ‘জঙ্গি ইসলামকে’ মোকাবিলা করার জন্য পাশ্চাত্যের কি রাশিয়ার সহযোগিতা দরকার?  টনি ব্লেয়ারের এমন একটি প্রস্তাবই এখন বিশ্বে ধর্ম ও ভূ-রাজনৈতিক আলোচনায় স্থান পেয়েছে।

প্রস্তাবটির সারকথা এমন যে মুসলিম মনস্তত্ত্বের সাথে লড়াইয়ে রাশিয়া ও চীনের জোটবদ্ধ হওয়া উচিত।

ব্যাগহট তার লেখাতে এটা পরিষ্কার করেছেন যে ব্লেয়ারের ইসলামী চরমপন্থাকে সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে নির্ধারণ করার বিষয়টি কোনো অসাধারণ আবিষ্কর নয় এবং তার প্রস্তাবগুলো সাহায্যকারী নয়।

এই যে তিনি বলছেন, জিহাদিদের সাথে রাশিয়ার মোকাবিলা হওয়া উচিত এটা আলোচনার দাবি রাখে। কারণ পশ্চিম ইউরোপে এমন অনেকগুলো দেশ আছে যারা এ তত্ত্ব গ্রহণ করবে।

যেহেতু ব্লেয়ার ঐতিহাসিক বিষয়াদি সামনে রেখে কথা বলছেন, চলেন আমরাও তাই করি।

সময় পরিক্রমায় পশ্চিমা শক্তি, রাশিয়া ও ইসলামী বিশ্বের সাথে একটা ত্রিমাত্রিক সম্পর্ক বিরাজমান ছিল। ইসলামকে মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের পরিবর্তে তারা বরং ইসলামী বিশ্বকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের প্রতিযোগিতায় আছে।

উনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়াকে ঠেকানোর জন্য দুর্বল অটোম্যান সাম্রাজ্যকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন রাণী ভিক্টোরিয়া এবং মনে হচ্ছিল তিনি চাচ্ছিলেন ইস্তাম্বুল মুসলিম শাসনে থাকুক।

স্নায়ুযুদ্ধের সময়গুলোতে যখন রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রেষারেষি চরমে তখন যুক্তরাষ্ট্র তার মুসলিম মিত্রগুলোকে ব্যবহার করে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বিরোধী লড়াইয়ে নামিয়ে দেয়। এতে অবশ্য মুসলিম দেশগুলোর সাথে বন্ধুত্ব করতে রাশিয়ার কোনো সমস্যা হয়নি। তবে সেক্যুলার দেশের বাইরেেআর কারও সাথে সেটা করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

নাইন ইলেভেনের কয়েক বছর পরে মনে হচ্ছে একটি নতুন ত্রিভুজের সৃষ্টি হচ্ছে। আমেরিকায় আক্রমণের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ভ্লাদিমির পুতিন যে বার্তাটা দিতে চাচ্ছিলেন সেটা মনে হচ্ছে এমন- ‘এইটা তো তোমাদের ভুলের কারণেই হয়েছে। তোমরা সুন্নী চরমপন্থীদেরকে জায়গা দিয়েছো, লালন পালন করেছ। যে ফ্রাংকেনস্টাইন তোমরা সৃষ্টি করেছো এখন চলো একসাথে লড়ি’।

অল্প সময়ের জন্য হলেও পাশ্চাত্য এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। এই সুযোগে পুতিন হাত খুলে চেচেন বিদ্রোহীদেরকে দমন শুরু করে দেয় এবং আফগানিস্তানের ক্ষমতা থেকে তালিবানদেরকে সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও কাজ করেন।

কিন্তু রাশিয়া আরও বেশি কিছু চাচ্ছিল। বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত মধ্য এশিয়াতে শক্ত অবস্থান নিতে চাচ্ছিল যেটাতে পাশ্চাত্যের সায় ছিল না। এখানেই পাশ্চাত্যের সাথে রাশিয়ার মধুচন্দ্রিমার অবসান ঘটে।

সে যাই হোক, মুসলিম বিশ্বের সাথে মোকাবিলার ক্ষেত্রে রাশিয়া কেমন মিত্র হতে পারে? বিভিন্ন সময়ে পুতিন ইসলাম নিয়ে সাংঘর্ষিক মতামত দিয়েছেন।

যখন একজন ফরাসি সাংবাদিক চেচনিয়া নিয়ে একটি কড়া প্রশ্ন ছুড়েন তখন একটি অশ্লীল উত্তর দিয়েছিলেন পুতিন। তিনি প্রশ্নকর্তাকে আহ্বান করেন তিনি যেন ইসলামিকভাবে খৎনা করে আসেন।

তিনি আরেকবার দেখতে পান যে অনেক মানুষের মতেই পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিস্টধর্ম ক্যাথোলিসিজমের চেয়ে ইসলামের অনেক নিকটে।

এখন মুসলিম বিশ্বে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আবারও রাশিয়া ও পাশ্চাত্যের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সিরিয়া এক্ষেত্রে উত্তম উদাহরণ। শিয়া-সুন্নী সংকটের মধ্যে আরও সংকট হচ্ছে পাশ্চাত্য ও রাশিয়ার মধ্যে সংকট।

এটা বললে খুব পাতলা কথা শুনায় যে পাশ্চাত্য এ সংকটে সুন্নীদের পক্ষে অবস্থান করছে এবং রাশিয়া ইরানের শিয়াদের সাথে দাঁড়িয়ে গেছে সিরিয়ার শিয়া শাসকগোষ্ঠীকে রক্ষা করার সংগ্রামে।

এক্ষেত্রে ইসলামী মৌলবাদ বিরোধী সংগ্রামে কিভাবে টনি ব্লেয়ারের পাশ্চাত্য ও রাশিয়ার ঐক্যের প্রস্তাব জায়গা পায়?

ইতিহাস সাক্ষী, মুসলিম বিশ্বে প্রত্যাশিত ফল আনতে রাশিয়া ও পাশ্চাত্যের জোটবদ্ধতার সম্ভাবনা নেই।

 

সত্য কথা বলতে গেলে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মুসলিম গোষ্ঠীর এক দলকে অন্য দলের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে এ দু’দল।

আচ্ছা ঠিক আছে, ধরেন ইসলামী বিশ্বের সাথে লড়াই করার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের পুরনো ভুলগুলো শুধরে উঠলো। তার মানে কি এই যে তারা পুতিনের সাথে একসাথে কাজ করতে সক্ষম হবে?  এটা এই সময়ে প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। কারণ রাশিয়া এখন তার ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য ইসলামের পক্ষে থেকে শুরু করে বিপক্ষে যে কোনো স্লোগান দিতেই প্রস্তুত।

তবে এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের যে বড় ভুলটার কথা বলা জরুরি, তারা রাশিয়ার সাথে সমন্বিতভাবে যুদ্ধ করতে গিয়ে জিহাদিদের মত বাচ্চা কুমিরকে লালন করেছে। যার ফলাফল হচ্ছে আল-কায়েদার আবির্ভাব।

এটা নিশ্চিতভাবে একটা ভুল সিদ্ধান্ত। এখন রাশিয়াকে নিয়ে বা রাশিয়াকে ছাড়া মুসলিম বিশ্বে কোনো গঠনমূলক লক্ষ্য অর্জন পাশ্চাত্যের জন্য অনেকটা অসম্ভবই।

(২৫ এপ্রিল বিশ্বখ্যাত ইকোনোমিস্ট সাময়িকীতে ‘Russia, Islam and the West: Shifting sands’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধটির ভাষান্তর করেছেন সাবিদিন ইব্রাহিম।)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।