‘সারা জীবন আওয়ামী লীগ করে আমার ছেলে গুম হয় কেমনে!’

“গর্ভধারণের সাত মাস পর আমার সন্তানের জন্ম হয়েছিল। তখনো তার চোখ ফোটেনি। অনেক কষ্ট করে এ সন্তানকে মানুষ করেছি। আমার সন্তান আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।… সারা জীবন আমরা আওয়ামী লীগে ভোট দিয়েছি। এখন আওয়ামী লীগের লোকদের হাতে আমাদের ছেলে গুম হয় কেমনে!” আহাজারি করে সাংবাদিকদের এসব কথা বলছিলেন রাজধানীর সবুজবাগের বাসিন্দা শাহানারা বেগম।

প্রায় তিন মাস আগে অপহৃত হওয়া ছেলে রফিকুল ইসলাম সোহেলকে (২৫) ফিরে পেতে রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (ক্র্যাব) সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন স্বামী ছানাউল হক, দুই সন্তান ও বেশ কজন স্বজন।

সংবাদ সম্মেলনে তারা জানান, সোহেল সবুজবাগ থানার ৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে দুই বন্ধু মো. রাসেল ও স্পর্শ আহমেদ নাসেরের ফোন পেয়ে সবুজবাগের ৩১৫ নম্বর বাসাবো ওহাব কলোনির বাসা থেকে বের হন। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।

শাহানারা বলেন, আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সোহেলকে পাওয়া যায়নি। সবুজবাগ থানায় মামলা করতে গেলে ওসি নানা টালবাহানা করেন। তিন দিনের চেষ্টায় গত ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ মামলা নেয়।

মামলায় সোহেলের বন্ধু মো. রাসেল (২৮), তার স্ত্রী মৌ বেগম (২০), আরেক বন্ধু স্পর্শ আহমেদ নাসের (২৫), রাসেলের স্ত্রীর বড় বোন মুন্নি আক্তার (২২), রাসেলের খালুশ্বশুর দুলাল (৪০) ও মৌ-এর কথিত প্রেমিক মো. আরাবী(২০) এবং অজ্ঞাত পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করা হয়। কিন্তু মামলা করার পরদিনই আসামিরা হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেয়।

শাহানারা জানান, ১৩ ফেব্রুয়ারি সোহেল বাসায় না ফেরায় পরদিন রাসেল ও নাসের তাকে দিয়ে সবুজবাগ থানায় একটি জিডি করান। এতে বলা হয়, ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সোহেল বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। পরদিন সকালে ০১৯৬৪৭৯৯৪৩০ নম্বরের মোবাইল ফোনে সোহেলের সঙ্গে কথা হয় এবং তিনি বাসায় আসছেন বলে জানান।

শাহানারা বলেন, “আসলে ঘটনার দিন বিকেলে আসামি রাসেলের স্ত্রী মৌ বেগমকে খোঁজার অনুরোধ করে অন্য আসামিরা সোহেলকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে সোহেলের পরিচয় দিয়ে তার মোবাইল (০১৬৮৫৪৪৭৯৮৩) থেকে আমার মোবাইলে (০১৯৬৫১৬৬৯১৯) দুলাল ফোন করে।”

পুরো ঘটনার সঙ্গে সবুজবাগ ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গোলাম মোস্তফা জড়িত বলে অভিযোগ করে সোহেলের পরিবার। তাদের ভাষ্য, মোস্তফার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সব সময় পাশে থাকতেন সোহেল। এ ছাড়া মোস্তফার এলপি গ্যাসের ব্যবসায় বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন তিনি। কিন্তু তার সন্ধানের ব্যাপারে মোস্তফা কিছুই করছেন না। এমনকি আইনগত কোনো কাজেও তিনি সোহেলের পরিবারকে সহযোগিতা করছেন না।

শাহানারা বলেন, “১৪ ফেব্রুয়ারি আসামিরা জানায়, সোহেল চাকরির জন্য জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে নারায়ণগঞ্জে গেছে। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাকে পাওয়া যায়নি। ১৭ ফেব্রুয়ারি মোস্তফা আমাকে ফোনে জানান, পরদিন তার বাসায় গিয়ে দেখা করতে। দেখা করার পর তিনি (মোস্তফা) জানান, রাসেলের স্ত্রীকে খুঁজতে দুলাল ও মুন্নীর সঙ্গে সোহেল নারায়ণগঞ্জ গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। কিন্তু সোহেলের ব্যবহৃত এয়ারটেলের সিম দুলালের কাছে পাওয়া যায়। এরপর সোহেলকে উদ্ধারে মোস্তফা দুই দিনের সময় দেন আসামিদের। এরপর তারা পালিয়ে যায়।”

সোহেলের ছোট ভাই সফিকুল ইসলাম সজল সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেন, রাসেলের স্ত্রীর সঙ্গে সোহেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এ ছাড়া সবুজবাগ থানার ৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নতুন কমিটির পদ-পদবি নিয়েও বন্ধুদের সঙ্গে তার শত্রুতা তৈরি হতে পারে। কারণ আওয়ামী লীগের নেতা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার কাছের লোক ছিলেন সোহেল।

এদিকে নতুন বার্তা ডটকম থেকে গোলাম মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “সোহেল আমার খুব কাছের ছিল। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকে। সোহেলের পরিবারকে হয়তো আমার কোনো প্রতিপক্ষ টাকার বিনিময়ে আমাকে ফাঁসাতে বলেছে। এ কারণেই তারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে।”

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মো. মাহবুব  বলেন, “আসামিরা আদালত থেকে জামিন নিয়ে পালিয়ে গেছে। এখন তাদের জামিন বাতিল করে রিমান্ডে নেয়ার চেষ্টা করছি। মোবাইল ফোনের কললিস্ট যাচাই করে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে মনে হচ্ছে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার রহস্য বের হবে।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।