ফেনীর প্রশাসনের প্রতি আস্থার অভাব জনগণের

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি একরামুল হক একরাম নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা ফুলগাজীসহ ফেনীবাসীর মাঝে যেমন পরিস্কার তেমনি মিডিয়াগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে বেরোচ্ছে ফেনী-২ আসনের এম.পি এবং জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর সম্পৃক্ততার কথা। কিন্তু জনগণের মুখে মুখে ও আকারে ইঙ্গিতে প্রকাশ পাচ্ছে ফেনীর প্রশাসনের প্রতি আস্থার অভাব।

ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া, নিহত একরামের পরিবার-পরিজন, সন্ত্রাসী ও নির্যাতনে ভুক্তভোগী মানুষ এবং ফেনীর সাধারণ জনগণ সাংসদ নিজাম হাজারীর দিকেই প্রথমে সন্দেহ ও পরবর্তীতে প্রকাশ্যে দায়ী করে আসলেও একরামের নিজ এলাকা ফুলগাজী ছাড়া ফেনী সদর উপজেলাতে যদিও প্রকাশ্যে কেউ সরাসরি মিছিল, সমাবেশ বা প্রতিবাদ করছে না নিজাম উদ্দিন হাজারীর বিরুদ্ধে।
কিন্তু নিজাম হাজারী প্রথমে ফুলগাজীর বিএনপি নেতা মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনার ও পরবর্তীতে জয়নাল হাজারী এবং পুনরায় মিনারকে একরাম হত্যায় দায়ী করে আসছেন। প্রতিদিনের তদন্ত এবং মিডিয়াগুলোতে বার বার নিজাম হাজারী সহ তার সাঙ্গপাঙ্গ নেতা বা ক্যাডারদের নাম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে।

শুরু থেকে যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা প্রত্যেকেই নিজাম হাজারীর লোক। গ্রেফতারকৃতরা সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর নির্দেশে অপারেশনের কথা বলেই কিলিং মিশনে সহায়তাকারীদের স্পটে জড়ো করেছিলেন কমিশনার শিবলু ও আবিদ। গ্রেপ্তারকৃত অন্যতম কিলার আবিদ সম্পর্কে এমপি নিজাম হাজারীর মামাতো ভাই। আবিদের মা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। হত্যাকাণ্ডের দিন সন্ধ্যায় পৌর ভবনে গিয়ে নিজাম হাজারীর সঙ্গে সাাৎ করেছিল আবিদসহ কিলারদের কয়েকজন। সে সময় তোলা একটি ছবিতে দেখা গেছে নিজাম হাজারী ও আবিদের হাস্যোজ্জ্বল মুখ। আবিদ ছাত্রদল কর্মী বলে প্রচার করা হলেও মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীর ছেলে কিভাবে ছাত্রদল কর্মী হয় এবং ছাত্রদলের রাজনীতি করলে সে কিভাবে ঘটনার দিন এমপির সঙ্গে পৌরভবনে গিয়ে বৈঠক করে এ প্রশ্ন মানুষের মুখে মুখে। হত্যাকান্ডের পর এমপির সঙ্গে খুনিদের বৈঠক ও শহরে প্রকাশ্যে তাদের ঘুরে বেড়ানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের স্বজনরাও। হত্যাকান্ডের মূল হোতা জেহাদ চৌধুরীকে ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক পদ থেকে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন নিজাম হাজারী। গ্রেপ্তারকৃত কমিশনার শিবলু আওয়ামী লীগ নেতা এবং নিজাম হাজারীর অনুগত। গ্রেপ্তারের দিন সকালবেলা তিনি ছিলেন এমপির বাড়িতে। পুলিশ তাকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করতে চাইলে সে আত্মসমর্পণ করবে বলে পুলিশকে ফিরিয়ে দেন এমপি। এ ঘটনা সেখানে উপস্থিত সবাই দেখেছেন। গ্রেপ্তারকৃত সিপাত, সৈকত ও শিপনসহ অভিযুক্তদের বেশির ভাগই নিজাম হাজারীর মিছিল-মিটিংয়ের সক্রিয় মুখ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে শিপনকে এমপি নিজামের বডিগার্ডের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে। পুলিশের কাছে দেয়া ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে গ্রেপ্তারকৃত আবিদ জানায়, ‘নিজাম হাজারীর অপারেশন’-এর কথা বলে সহযোগীদের সেখানে জড়ো করা হয়। সহযোগীরা জানতেন, নিজাম হাজারীর অপারেশন হলে প্রশাসনের তরফে কোন বিপদ হবে না। জিজ্ঞাসাবাদের সময় একরামের পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া ছবি দেখানো হলে আবিদ অনুশোচনা করে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সময় নিজাম হাজারী ঢাকায় অবস্থান করলেও তার সঙ্গে ফোনালাপ করেছে খুনিদের কয়েকজন। একরাম হত্যাকান্ডের দিন একরামের গতিবিধি সম্পর্কে খুনিদের অবগত করেছে একদা তার ঘনিষ্ঠ ফুলগাজীর টুপি বেলাল। টুপি বেলালের বাড়িতে গতকাল অগ্নিসংযোগ করেছে একরাম সমর্থকরাসহ এলাকাবাসী। অভিযোগ উঠেছে, একরামের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির পর সে নিজাম হাজারীর আশ্রয়ে থাকতো। প্রায়ই তাকে জেহাদ চৌধুরীর সঙ্গে এমপির বাসায় দেখা যেতো। এছাড়া টেন্ডার ও জেলা আওয়ামী লীগের পদ নিয়ে দ্বন্ধ, জেল-জালিয়াতির প্রতিবেদন নিয়ে একরামকে দোষারোপ, ডায়াবেটিস হাসপাতালে একরামের কে তালা লাগানো, একরামের পে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় ফুলগাজী যুবলীগ নেতা লোকমান হোসেনের ওপর হামলা, পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আরমানকে বহিষ্কার ও সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত ফুলগাজী সদর ইউপি ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়ার সৃষ্ট বিরোধের কারণে হত্যাকান্ডে এমপি নিজামের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে এমন সন্দেহ খোদ নিহতের স্বজনদের। অস্ত্রের যোগানদাতা হিসেবে শিবলু ও জেহাদ চৌধুরীর নাম এলেও একরামের ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, তারা সে অস্ত্র সংগ্রহ করেছেন জিয়াউল আলম মিস্টার ও শাহেদুল ইসলাম মামুনের কাছ থেকে। এদিকে হত্যা ঘটনায় মূল নির্দেশদাতা হিসেবে নিজাম হাজারী ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে আদেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর বিচারের দাবি এড়িয়ে নিজাম-আদেলকে বাঁচাতে এখন মরিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ফেনী আওয়ামী লীগের মুরব্বি আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিমের নির্দেশে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রতিটি উপজেলায় নিজামের পে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করা হয়। একরাম হত্যার বিচার দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা ও পোস্টার-ব্যানার সাঁটানোর ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের তরফে কড়া নিষেধ করা হয়েছে দলের নেতাকর্মীদের। নেতাকর্মীদের বিােভের মুখে নিজাম হাজারীকে ফুলগাজীতে না পাঠাতে ঢাকায় আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিমের কাছে ফোন করেছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলিম। কিন্তু নিজাম ফুলগাজীতে যাবেন এবং সেখানে তার নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব আলিমকেই নিতে হবে বলে নির্দেশ দেন নাসিম। তার সে নির্দেশ পালন করতে গিয়ে ফুলগাজী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের চুশূল হয়ে পড়েছেন আবদুল আলিম। এছাড়া একরামের মাগফেরাত কামনা করে জেলা আওয়ামী লীগের তরফে একটি মিলাদ না হলেও নিজামের বিপদমুক্তি কামনায় পড়ানো হয়েছে একাধিক মিলাদ। এতে ফেনীবাসীর মনে নিজাম হাজারীর প্রতি রহস্যেময় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

হত্যাকান্ড বাস্তবায়নের অর্থের যোগানদাতা হিসেবে প্রথমেই আলোচনায় উঠে আসে একরামের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিএনপি নেতা মাহতাবউদ্দিন মিনার চৌধুরীর নাম। ঘটনার দিন তাকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু দিন দিন বেরিয়ে আসছে নতুন তথ্য।

একরামের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন জানিয়েছেন, একরাম এমপি নির্বাচন করলে শূন্য আসনে তিনি উপজেলা নির্বাচনের জন্য নানামুখী তদবির-তৎপরতা চালান। এদিকে একরামের মৃত্যুর এক সপ্তাহ না পেরোলেও একরামের শূন্য আসনে উপনির্বাচনে তাকে সমর্থন দেয়ার ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগে আলোচনা হয়েছে। এদিকে ঢাকায় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন মিনার চৌধুরীর ভাইপো অনিক। তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ফের জোরেশোরে আলোচনায় উঠে এসেছে মিনার  চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা।

একরাম হত্যার সঙ্গে জড়িত ১৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তবে ফেনী পুলিশের অধীনে রিমান্ড এবং মামলার তদন্ত নিয়ে আস্থা নেই সাধারণ মানুষের। এছাড়া থানার ১০০ গজের মধ্যেই নিজের অপকর্মস্থল থেকে মডেল থানা নিয়ন্ত্রণ করতো জেহাদ চৌধুরী। সে সম্পর্ক ভুলে পুলিশের পে গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে তথ্য আদায় কতটুকু সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে সন্দিহান সবাই। সাধারণ মানুষ মিডিয়ায় এভাবে সংবাদ প্রকাশের কারনে মনে করছে, নিজাম হাজারীর কলকাঠিতেই খুনের ব্যাপারে আগাম তথ্য জানতো স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু একরামকে রায় কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি প্রশাসন। তাদের কাছে একরামের গাড়িচালক সাহায্য চাইলেও হত্যাকান্ডের সময় তারা কিলিং স্পটের দিকে আসেনি, এমন অভিযোগ উঠলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি ফেনী পুলিশের বিরুদ্ধে।

এদিকে গ্রেপ্তারের প্রথম দিন কমিশনার শিবলুকে ওসির রুমে রাত কাটাতে দেয়া, পছন্দমতো হোটেল থেকে দামি খাবার এনে দেয়ার ঘটনায় সে সন্দেহ আরও বেড়েছে। তারই পরিপ্রেেিত রোববার উপজেলা চেয়ারম্যান ফাউন্ডেশনের নেতারা গ্রেপ্তারকৃতদের অন্য কারাগারে ও মামলার তদন্তভার সিআইডির কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে।

ফেনী আওয়ামী লীগের কুট-বুদ্ধি ও পরামর্শদাতা হিসেবে খ্যাত জেলা যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আদেল। দুই হাজারীর আমলেই তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালে পরামর্শদাতা। আদেলের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। রাজাঝির দীঘির উত্তরপাড়ে সড়ক ও জনপথের ডাকবাংলোর একটি ককে নিজের অফিস বানিয়েছিলেন আদেল। সেখানে বসেই রাজনৈতিক গুটিবাজি, চাঁদাবাজি, জমির দালালি, দখল-বেদখল বাণিজ্য, শালিস বাণিজ্যসহ নানা অপকর্ম চালাতেন বলে শহরের মানুষ অভিযোগ করেন।

মিডিয়ায় পরিস্কারভাবে প্রকাশিত হয় শহরের পূর্ব উকিলপাড়ায় তার বাড়িটি দখলকৃত। সেটি দাগনভূঁইয়া জনৈক সরকারি কর্মকর্তা মরহুম মোজাম্মেল হকের বাড়ি। মোজাম্মেল হকের ছেলেরা সরকারি চাকরিজীবী ও ঢাকায় অবস্থান করতেন। ফেনীর বাড়িতে থাকতেন এক ছেলে খুরশিদ হাসান পিস। চিরকুমার খুরশিদ হাসানকে মানসিকভাবে অসুস্থ প্রতিপন্ন করে তার বাড়িটি দখল করে নেয় আদেল। বাড়ি দখলের পর আবার ভাল মানুষের মতো শহরের একটি হোটেলে খুরশিদকে তিন বেলা ভাল-মন্দ খাবার ব্যবস্থাও করে দেন।

অপরদিকে আনন্দপুর হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত বেলাল ও আলাউদ্দিনের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে একরাম সমর্থক প্রতিবাদে উত্তাল ফুলগাজীবাসী। হত্যায় পরিকল্পনাকারীসহ হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে দাবিতে এখন সোচ্চার ফুলগাজী আওয়ামী লীগ ও সাধারণ মানুষ। একরাম হত্যার সঠিক বিচারের দাবীতে ফুলগাজীতে প্রতিদিন প্রতিবাদ ও ক্ষোভে ফুঁসে উঠছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।