জামায়াতের আমির মাওলানা নিজামীর ফাঁসির আদেশ

জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চারটি অভিযোগে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বুধবার দুপুরে চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।

 

রায়ের সময় চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুসহ প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে নিজামীর ছেলে নাজিব মোমেন ও আইনজীবী তাজুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

 

বেলা ১১টা ১০ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রায় পড়া শুরু হয়। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে তা শেষ হয়। মোট ৪০২ পৃষ্ঠার রায়ে তাকে এ শাস্তি দেয়া হয়। নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত ১৬টি অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল চারটি অভিযোগে তাকে ফাঁসির আদেশ দেন।

 

বাকি চারটি অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া প্রমাণিত হয়নি এমন আটটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার পরে নিজামী কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তাকে কাঠগড়ায় অবিচল দেখা গেছে।

 

প্রমাণিত আটটি অভিযোগ হলো- ১, ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৮ ও ১৬। এর মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। প্রমাণ হয়নি এমন অভিযোগ হচ্ছে- ৫, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫।

 

জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মামলার রায় ঘোষণার মধ্যদিয়ে উভয় ট্রাইব্যুনাল থেকে ১০টি রায় ঘোষণা করা হলো। এই ১০টি রায়ে ১১ জন ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন ট্রাইব্যুনাল।

 

এছাড়া ট্রাইব্যুনাল-১ এ জামায়াত নেতা রংপুরের এটিএম আজহার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোবারক হোসেন, বিএনপি নেতা ফরিদপুরের জাহিদ হোসেন খোকন এবং ট্রাইব্যুনাল-২ এ জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী ও জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি সৈয়দ মো. কায়সারের মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে। আর আপিল বিভাগে অপেক্ষমান রয়েছে জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলা।

 

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাইব্যুনাল থেকে নিজামীর রায়ই প্রথম হলো। এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেন সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ।

 

এর আগে বুধবার বেলা সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকজন ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের নির্ধারিত প্রথম সারির বেঞ্চে বসলে সেটি ভেঙে যায়। পরে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল থেকে আরেকটি বেঞ্চ এনে সেখানে বসানোর জন্য রায় দিতে কিছুটা বিলম্ব হয়।

 

বেলা ১১টা ৮ মিনিটে চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন বিচারপতি ট্রাইব্যুনালের এজলাস গ্রহণ করেন। এরপরই রায় নিয়ে বক্তব্য দেন এম ইনায়েতুর রহিম।

 

রায় উপলক্ষে সকাল সোয়া নয়টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নিজামীকে ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় রাখা হয়। হাজতখানা থেকে বেলা ১১টার দিকে নিজামীকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। এ সময় তার পরনে ছিল সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি ও খয়েরি রঙের জিন্না টুপি।

 

এরও আগে বেলা ১০টার দিকে ট্রাইব্যুনালে আসেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিম। একই সময়ে আসামিপক্ষে নিজামীর চার ছেলে এবং দুই মেয়ের মধ্যে ছেলে ও তার আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, এডভোকেট তাজুল ইসলাম উপস্থিত হন।

 

এর আগে গত ২৪ জুন এ মামলার রায় ঘোষণার কথা থাকলেও নিজামী অসুস্থ থাকায় রায়টি পুনরায় সিএভি রাখা হয়। রায় ঘিরে ট্রাইব্যুনাল ও এর আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তল্লাশি করে সবাইকে আদালতের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়। সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।

 

উল্লেখ্য, একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে একই বছরের ২ আগস্ট এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।