মশিউর রহমান সেলিম, জেলা দক্ষিন প্রতিনিধি, কুমিল্লা:
কুমিল্লা দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন হাট-বাজারে কোরবানী পশুর চামড়ার দর নিয়ন্ত্রন নিয়ে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের মধ্যে চলছে নানাহ নাটকীয় সমীকরন। এতে মারাত্মক বিপাকে পড়েছে এলাকার ক্ষুদ্র মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা। এবারও অতীতের মত মৌসুমী ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলের চামড়ার বাজার দখল করে নিয়েছে। হরেক রকম ফড়িয়া ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতার কারনে বেশির ভাগ চামড়াই কিনতে পারেনি প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীরা। সরকারের নির্ধারিত পশুর চামড়ার মূল্য কার্যকর না হওয়ায় মৌসুমী চামড়া ব্যাবসায়ীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জেলা দক্ষিনাঞ্চলের সবকটি উপজেলার হাটবাজারে গরুর চামড়া ২০০-৪০০টাকায় এমন কি কোন কোন চামড়া ১০০টাকায় বিক্রি হয়েছে। চামড়া সংরক্ষন, লবন সংকট ও শ্রমিকদের বাড়তি মুজুরী নিয়েও বিপাকে পড়েছে একাধিক চামড়া ব্যাবসায়ী। ছাগলে চামড়া ও গরুর মাথার চামড়া কেনার মতো বাজারে নেই কোন ক্রেতা। আড়ৎদার ও মৌসুমী চামড়া ব্যাবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতায় চামড়া শিল্প অনেকটাই ধবংসের পথে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের মৌসুমী চামড়া ব্যাবসায়ীদের বোবা কান্না দেখার মত কেউ নেই। এ বছর কোরবানী ঈদে উপজেলা গুলোর হাট বাজারে চামড়া ব্যাবসায়ীদের সেন্টিকেট কারসাজিতে চামড়া ব্যাবসায় ধস নেমেছে।
জানা যায়, জেলা দক্ষিনাঞ্চলের ৫টি উপজেলার ক্ষুদ্র মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পশুর চামড়া কিনে লোকসানের মুখে পড়েছে তারা। এতে স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের নানাহ সমীকরনকে দায়ী করছেন ক্ষতিগ্রস্ত মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা। এ অঞ্চলে হাতেগুনা কয়েকটি বড় বড় চামড়া আড়তদার সেন্ডিকেট করে বিভিন্ন অজুহাতে দাম কমিয়ে চামড়ার দর নিয়ন্ত্রন নিজেদের হাতে রেখে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের লোকসানের ঝুঁকিতে ফেলেছে। ঈদের দিন বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শনিবার সারাদিন চামড়া বেচা-কেনা নিয়ে ওই সিন্ডিকেট চক্রের চলে হরেক রকম নাটকীয়তা।
এলাকার বিভিন্নস্থান থেকে দলে দলে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা শত শত পশুর চামড়া আড়তদারদের ঘরের সামনে ফেলে রেখে মাথায় হাত দিয়ে দীর্ঘক্ষন বসে থাকতে দেখা যায়। কারন কোন চামড়া ব্যবসায়ী মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনছে না। বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা জানায়, নির্ধারিত দামেও চামড়া কিনছেনা আড়তদাররা। তারা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দর কমিয়ে দিয়েছে। মফস্বল এলাকায় চামড়ার ফুট হিসাবে ৪০/৪৫টাকা নির্ধারন করে দিলেও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা কিছুটা বেশি দামে কেনায় গড়ে চামড়ার ফুটে দর দাম একই পর্যায়ে ছিল। কিন্তু ঈদের দিন কোন কোন আড়তদার চামড়া গড় হিসাবে ২শ থেকে ৪’শ টাকা পর্যন্ত কিনলেও কোন কোন ক্ষেত্রে হঠাৎ করে ১’শ থেকে ২’শ টাকায় নেমে আসে। আবার ঈদের পর দিন শুক্রবার মৌসুমী ব্যবসায়ীদের আনা চামড়ার বিপুল আমদানী দেখে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা নড়েচড়ে উঠে। তারা সু-কৌশলে চামড়া কেনা বন্ধ করে দিলে বিপাকে পড়ে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। ফলে কেনা দামের চেয়ে অনেক কম দামে ওইসব চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।
ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন শত শত মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী। আড়তদারদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা না পাওয়ায় অর্থাভাবে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের অনেকেই চামড়া কিনতে পারেনি। এবারে প্রতিবছরের ন্যায় পাড়া মহল্লার অলিগলিতে মৌসূমী চামড়া ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বেশি থাকায় আড়তদাররা সুযোগ বুঝে চামড়ার বাজার দর নিয়ে শুরু করেন ভেলকিবাজি আর নাটকীয়তা। এ অঞ্চলে ৫০/৬০টি বড় চামড়া ব্যবসায়ী বিভিন্ন কারনে তেমন কোন চামড়া কেনার উৎসাহ দেখাইনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদের পরদিন শুক্রবার এ অঞ্চলের প্রধান চামড়ার আড়ত লাকসাম উপজেলার দৌলতগঞ্জ বাজারের চামড়াপট্টিতে এ বছরের চিত্র ছিল অনেক নাটকীয়তা। চামড়া বেচাকেনায় বাজার দর নিয়ে অনেক গোপনীয়তা এবং এজেন্ট কিংবা দালাল দিয়ে চামড়া কেনাসহ চলে হরেক রকম সমীকরন। সাম্প্রতিক চামড়া শিল্পে ধ্বসের আশংকায় দেশের ট্যানারী মালিকদের বেঁধে দেয়া চামড়া দরের চেয়ে কেউ কেউ আরও বেশি দামে চামড়া কিনেছে। এ নিয়ে মৌসুমী ব্যবসায়ী- ফড়িয়া আর আড়তদারদের বেঁধে দেয়া চামড়ার বাজার দর নিয়ে উঠেছে হাজারো বির্তক। পর্দার অন্তরালে চামড়ার বাজার দর নিয়ে কি ঘটে চলেছে তা জানতে চায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।
লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজারের চামড়া ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র জানায়, মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা অনেক কিছুই বলে থাকেন তারপরও তাদের অভিযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই। যারা প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ী তারা নির্ধারিত দামে চামড়া কিনে ঠিকই লাভবান হয়েছেন। তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ তাড়াহুড়া করে বেশি দামে চামড়া কিনে নিজেদেরকে লোকসানের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। এতে কারই কিছু করার নেই। তবে চামড়ার বাজার দর প্রশাসনিক ভাবে মনিটরিং করা হলে আজকে হয়তো এ বির্তক উঠতনা।
মৌসুমী ব্যবসায়ীদের আমরা বার বার বলেছি পশুর চামড়াগুলো তাড়াতাড়ি আড়তে নিয়ে আসুন এবং লবন দিন। আবহাওয়া অত্যন্ত গরম চামড়াগুলো টিকাতে পারবেন না। আবার মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ চামড়া কিনে অধিক মুনাফার আশায় ধীরগতিতে নিজেদের কাছে রেখে চামড়া নষ্ট করে নিয়ে আসলে আড়তদারদের কি করার আছে? ওই নষ্ট চমড়াতো লোকসান দিয়েই বেঁচতে হবে। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সূত্রটি জানায় এ অঞ্চলে চামড়া শিল্পে সিন্ডিকেট বলতে কিছুই নেই। তাহলে জেলা দক্ষিনাঞ্চলের বরুড়া, লালমাই, সদরদক্ষিন, নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা ছাড়াও পাশের জেলাগুলো থেকে লাকসাম উপজেলার এ বাজারে শত শত চামড়া আসতো। প্রতিবছরের মতো ঈদের আগে সরকার চামড়ার মূল্য নির্ধারন করে দিলেও তা কার্যকর হয়নি। চামড়া ব্যবসায়ীদের অনেকে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এ অঞ্চলের চামড়া ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে ট্যানারী মালিকদের দ্রুত বকেয়া পাওনা পরিশোধ করতে হবে। নচেৎ আগামী দিনে এ অঞ্চলের চামড়া ব্যবসা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।


