নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে হামের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। চলতি মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। একই সময়ে মৃত্যুও ঘটছে। এর মধ্যে ডেঙ্গুর নতুন ধরন ‘ডেন-৩ সেরোটাইপ’ সংক্রমণের বিষয়টি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, এ বছর পরীক্ষিত নমুনার বড় অংশেই ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এএমএ মুহিত সতর্ক করে বলেছেন, সময়মতো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে এনএস-১ পজিটিভ রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে সেরোটাইপিং করা হয়। এ বছর ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে জুলাইয়ের শেষ দিকে ও আগস্টের শুরুতে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত ৭১টি নমুনার সেরোটাইপিং করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টিতে ডেঙ্গুর ডেন-৩ ধরন শনাক্ত হয়েছে, যা মোট নমুনার প্রায় ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি নমুনাগুলোতে ডেন-২ ধরন পাওয়া গেছে।
আইইডিসিআরের মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ জানান, ডেঙ্গুর ধরন শনাক্ত করতে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে—ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। কোনো একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর সেই ধরনের বিরুদ্ধে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তবে অন্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে পরবর্তীতে ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ডেন-২ সেরোটাইপের প্রাধান্য ছিল। তবে চলতি বছর ডেন-২-এর পাশাপাশি ডেন-৩-এর উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে পাওয়া যাচ্ছে।
আইইডিসিআর পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকায় আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করেছে। চলতি বছরের জুনে বান্দরবান, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে ডেঙ্গু আক্রান্তদের নমুনা জরিপ করা হয়। এতে বরগুনা ও পটুয়াখালীর শহরাঞ্চলে ডেন-৩ বেশি পাওয়া গেলেও একই জেলার গ্রামাঞ্চলে ডেন-২-এর উপস্থিতি বেশি ছিল। বান্দরবানেও ডেন-২ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি পাওয়া যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু শহর বা নগরকেন্দ্রিক রোগ নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ন, ক্যান ও প্যাকেটজাত খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং এসব বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে রাখার কারণে সারা দেশেই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
পাশাপাশি পানি সংকটের কারণে অনেক এলাকায় পানি জমিয়ে রাখার প্রবণতাও এডিস মশার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে বলে জানান তিনি।
পাহাড়ি এলাকাতেও এডিস মশার প্রজননের বিভিন্ন উৎস তৈরি হচ্ছে। সুপারি গাছ কাটার পর গর্তে পানি জমে থাকা, বিভিন্ন পাত্রে পানি সংরক্ষণ এবং ওয়ানটাইম কাপসহ প্লাস্টিকসামগ্রী যত্রতত্র ফেলে রাখার কারণে সেখানে পানি জমে মশার বংশবিস্তার ঘটছে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৫৮ জন।
নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৩৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯ জন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩১৬ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৯৩ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৮ জন, খুলনায় ৩৩৪ জন, ময়মনসিংহে ৮৪ জন, রাজশাহীতে ১১২ জন, রংপুরে ৫৭ জন এবং সিলেটে নয়জন রয়েছেন।
চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৪৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বর্তমানে ১ হাজার ৩০০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডেঙ্গু সংক্রমণের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। জুনে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে হাসপাতালে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন।
অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও সংক্রমণের গতি কমেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৫৯০ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, গত দুই সপ্তাহে ডেঙ্গু সংক্রমণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। তবে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান তিনি।
রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সুরক্ষা দিতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোগীর সংখ্যা বাড়ায় চিকিৎসাসেবায় যাতে কোনো ধরনের ঘাটতি না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে সোমবার থেকে মাঠপর্যায়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এএমএ মুহিত।
রোববার বিকালে জাতীয় সংসদের টানেলে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, তথ্য ও ডাটার ভিত্তিতে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তাই অক্টোবরের আগেই সবাইকে সতর্ক হতে হবে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর সতর্কবার্তার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাসাবাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার বিস্তার রোধে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ডেঙ্গুর নতুন সেরোটাইপের উপস্থিতি এবং দ্রুত বাড়তে থাকা রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে এখনই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


