Homeজাতীয়এলপিজির কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তোলপাড়

এলপিজির কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তোলপাড়

অনলাইন ডেস্ক:
দেশের বাজারে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কয়েকটি কোম্পানি অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জানানো হলে শনিবার সচিবালয়ে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোটাব) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দেশে এলপিজি মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, দেশে চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করা হলেও বাজারে সংকট কেন তৈরি হয়েছে এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে কেন—লোটাব নেতাদের কাছে তা জানতে চাওয়া হয়।

তবে এলপিজি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লোটাব নেতারা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে। বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনতে এলপিজির দাম বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বৈঠক শেষে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

১,৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার আড়াই হাজারে

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত ২২ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির সংকট তীব্র হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার এলপিজি সিলিন্ডার কোথাও কোথাও আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি আমদানির ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কিছু অপারেটর এলপিজি মজুত করে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকটি কোম্পানি আগেভাগে তাদের ট্যাংকারে এলপিজি মজুত করেছে। আবার কিছু জাহাজ ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে বঙ্গোপসাগরের সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দাম বাড়ানোর চাপ?

বৈঠকে উপস্থিত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অপারেটররা রোববার থেকে এলপিজির দাম এক ধাপে বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান দামে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ওই ব্যক্তি জানান, লোটাব নেতারা জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেছেন—বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তাদের চাহিদা অনুযায়ী দাম বাড়াচ্ছে না।

মজুতের অভিযোগ অস্বীকার

এলপিজি মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি কোনো মজুত করেনি। বরং সেপ্টেম্বরে আগের তুলনায় কম এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, যার তথ্য এনবিআরের রেকর্ডেও রয়েছে।

বাজারে সংকট কবে কাটতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ফ্রেশ এলপিজি আরও বেশি আমদানির চেষ্টা করছে।

একইভাবে এলপিজি মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওমেরা পেট্রোলিয়ামের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী। তিনি বলেন, ওমেরাসহ কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি মজুত করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও বিষয়টি সত্য নয়। বাজারের সংকট কাটাতে সরবরাহ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

বাজারের ৬৮ শতাংশ চার কোম্পানির দখলে

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি ব্যবহার হয়। এর প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি করে। দেশে প্রায় ২৯টি এলপিজি কোম্পানি সক্রিয় থাকলেও বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ১২ থেকে ১৪টি কোম্পানি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারের প্রায় ৬৮ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করে চারটি কোম্পানি—ওমেরা পেট্রোলিয়াম, পেট্রোমেক্স, মেঘনা ও যমুনা স্পেসটেক। এছাড়া বিএম এনার্জি ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আয়গ্যাজ ৭ শতাংশ, ডেল্টা ৪ শতাংশ এবং জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজি প্রায় ৩ শতাংশ করে সরবরাহ করে।

বিইআরসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে প্রায় একই পরিমাণ এলপিজি দেশে এসেছে।

এলপিজি বিক্রির হিসাব চেয়েছে বিইআরসি

বাজারে চলমান সংকটের কারণ খতিয়ে দেখতে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানির কাছে সেপ্টেম্বর মাসের দৈনিক এলপিজি বিক্রির হিসাব চেয়েছে বিইআরসি।

কমিশনের সচিব নজরুল ইসলাম সরকার স্বাক্ষরিত চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে সেপ্টেম্বরের দৈনিক বিক্রির তথ্য দিতে বলা হয়েছে। শনিবার চিঠি দেওয়া হলেও রোববারের মধ্যে এসব তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আজ ঘোষণা হতে পারে নতুন দাম

নিয়ম অনুযায়ী, আজ রোববার অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে বিইআরসির।

এনবিআর থেকে এলপিজি আমদানিসংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে জ্বালানি বিভাগ ও বিইআরসি। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে এলপিজি আমদানিতে প্রতি টনে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ ডলার প্রিমিয়াম খরচ হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরামকোর কনট্রাক্ট প্রাইস (সিপি)ও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম নির্ধারণে এই সিপি প্রাইস গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি ব্যয়, স্থানীয় সরবরাহ ও বাজারে মজুত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অক্টোবরের এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণে কাজ করছে বিইআরসি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments