আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের কারণে ইসরাইল গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি কিংবা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুতর সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সংস্থাটির বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী শাখা ‘রেড সেল’-এর একটি গোপন মূল্যায়নে এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি।
‘ফ্র্যাকচার ফ্রম উইথিন’ (Fracture from Within) বা ‘ভেতর থেকে ফাটল’ শিরোনামের ওই মূল্যায়নে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সোমবার (৪ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে একাধিক সংকট একই সময়ে তীব্র হয়ে উঠেছে।
সিআইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইসরাইলের অর্থনৈতিক চাপ, ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয়, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক অসন্তোষ দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এসব সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও বাড়ছে সামরিক ব্যয়
দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক অভিযান ইসরাইলের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক তৎপরতায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সেনা ও রিজার্ভ সদস্যদের দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থাকতে হচ্ছে।
যুদ্ধের কারণে সামরিক ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়ছে। সিআইএর মূল্যায়নে অর্থনৈতিক মন্দা ও উচ্চ সামরিক ব্যয়কে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা নিয়ে তীব্র বিরোধ
ইসরাইলি সমাজে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্ক নতুন করে তীব্র হয়েছে অতি-অর্থোডক্স বা হারেদি ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নে।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশটির বিপুলসংখ্যক তরুণ ও রিজার্ভ সেনাকে সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এমন সময়ে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর বড় অংশ সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
এই ইস্যুটি শুধু সামরিক নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ইসরাইলের ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে তুলছে।
নেতানিয়াহুকে ঘিরে রাজনৈতিক সংকট
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার রাজনৈতিক লড়াইও দেশটির সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে সিআইএর ওই মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন নীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ইসরাইলে আগে থেকেই তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। বিচারব্যবস্থা ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে অতীতের বিতর্কের পাশাপাশি যুদ্ধ পরিচালনা, জিম্মি ইস্যু এবং সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনও অব্যাহত রয়েছে।
ফলে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হলে সামাজিক বিভাজন নতুন মাত্রা পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
দীর্ঘ যুদ্ধের মানসিক চাপ
গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক ইসরাইলি সেনা ও রিজার্ভিস্ট ইতোমধ্যে দায়িত্ব পালন শেষে নিজ নিজ জীবনে ফিরছেন। দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের একটি বড় অংশের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করছে বলেও মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা যুদ্ধের ফলে পরিবার, কর্মজীবন ও সামাজিক জীবনে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা সামগ্রিকভাবে সমাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে নিহত ও আহত সেনাদের সংখ্যা এবং জিম্মিদের ভাগ্য নিয়েও জনমনে উদ্বেগ রয়েছে।
পশ্চিম তীরে সহিংসতা ও সামাজিক বিভাজন
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘাতও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দখলকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা যেমন বাড়ছে, তেমনি ইসরাইলের অভ্যন্তরেও এ নীতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। একদিকে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো কঠোর অবস্থানের পক্ষে, অন্যদিকে সমাজের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান করছে।
আন্তর্জাতিকভাবে বাড়ছে চাপ
সিআইএর মূল্যায়নে ইসরাইলের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে দেশটির প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়ার বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে দেখা হয়েছে বলে আনাদোলুর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ও কূটনৈতিক চাপও তৈরি হয়েছে। এর ফলে ইসরাইলের পররাষ্ট্রনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক জোরালো হচ্ছে।
‘ভেতর থেকে ফাটল’—কতটা গুরুতর আশঙ্কা
সিআইএর ‘রেড সেল’ সাধারণত প্রচলিত বিশ্লেষণের বাইরে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বিকল্প পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ করে। ফলে এ ধরনের মূল্যায়নে কোনো সম্ভাব্য চরম পরিস্থিতির আশঙ্কা তুলে ধরা হলেও সেটিকে ভবিষ্যৎ ঘটনার নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
তবে ‘ফ্র্যাকচার ফ্রম উইথিন’ মূল্যায়নে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক ব্যয়, ধর্মীয়-সামাজিক বিভাজন এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ—সবগুলো সংকট একই সময়ে দেশটির ওপর চাপ তৈরি করছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাইরের চাপ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা যদি একই সঙ্গে বাড়তে থাকে, তাহলে ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌঁছালে গৃহযুদ্ধের মতো সংঘাত কিংবা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বড় ধরনের সংকটের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের চরম পরিস্থিতি অনিবার্য—এমন দাবি করা হয়নি। বরং রাজনৈতিক বিভাজন কমানো, সামাজিক উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চাপ মোকাবিলা করাই ইসরাইলের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে বিশ্লেষণটির সার্বিক চিত্র থেকে ধারণা পাওয়া যায়।


