সাইদীর রায় আজ,দেশব্যাপী হরতাল

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসিরে কুরআন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলার রায় আজ ঘোষণা করা হবে।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল রায়ের এ তারিখ ঘোষণা করেন। রায়ের তারিখ ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) রায় ঘোষণা করা হবে।’

এ দিকে সরকারের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড ও পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামাদের ওপর জুলুম-নিপীড়নের প্রতিবাদে এবং প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তি দাবিতে জামায়াতে ইসলামী আজ বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান গতকাল দুপুরে এক বিবৃতিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগী নাস্তিক-মুরতাদরা ইসলাম, কুরআন, বিশ্বনবী সা:-কে অবমাননা করছে। দেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও সর্বস্তরের জনতা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তার প্রতিবাদ জানালে সরকার পুলিশ বাহিনী দিয়ে গুলি চালিয়ে ১৭ জনকে হত্যা করেছে। কয়েক হাজার আলেমকে আহত করেছে, লক্ষাধিক ইসলামপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছে।

সরকার দীর্ঘ ৩২ মাস ধরে আন্তর্জাতিক মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মিথ্যা মামলায় আটকিয়ে রেখেছে। সরকার ইসলাম উৎখাতের অংশ হিসেবে আলেমদের গায়ে হাত দিয়েছে। আলেমদের গুলি করে হত্যা করছে। বিশ্বনন্দিত মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে সরকার।’

বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আলেমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত বন্ধ ও অবিলম্বে বিশ্বনন্দিত মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করছি। এ কর্মসূচি সফল করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

রায়ের তারিখ ঘোষণা : গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির, সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়রুল হক সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল-১ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আজ বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করা হবে মর্মে আদেশ দেন।

রায়ের তারিখ ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি আশা করছি।

২০১১ সালের ৭ ডিসেম্বর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এক বছরের মাথায় ২০১২ সালের ৬ ডিসেম্বর মামলার সব কার্যক্রম শেষে রায়ের তারিখ অপেক্ষমাণ ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু স্কাইপ কেলেঙ্কারির জের ধরে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করার পর মাওলানা সাঈদীসহ অন্যান্য মামলার আবার বিচার দাবি করে দরখাস্ত করা হয় আসামিপক্ষ থেকে। সে আবেদন খারিজ হয়ে যায়। তবে মাওলানা সাঈদীর মামলায় আবার যুক্তি উপস্থাপন শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ১৩ জানুয়ারি আবার যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয় এবং ২৯ জানুয়ারি উভয়পক্ষের যুক্তি পেশ শেষ হলে সেই দিন দ্বিতীয়বারের মতো রায়ের তারিখ অপেক্ষমাণ ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ের তারিখ অপেক্ষমাণ ঘোষণার এক মাসের মাথায় নির্দিষ্ট করে তারিখ ঘোষণা করলেন ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালের প্রথম মামলা : ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলাটিই ছিল প্রথম মামলা। প্রথম মামলা হিসেবে এ মামলার কার্যক্রমও সর্বপ্রথম শেষ হয়েছিল; কিন্তু স্কাইপ কেলেঙ্কারির কারণে পিছিয়ে যায় এ মামলার রায় ঘোষণা। তবে ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে দু’টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়। তবে রাষ্ট্রপক্ষ ১৯টি অভিযোগের বিষয়ে সাক্ষী হাজির করে।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে বিচার হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর জেলার পারেরহাট বন্দর এলাকায় রাজাকার ও শান্তি কমিটি গঠনে নেতৃত্ব প্রদান; পারেরহাট ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়; আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনকে হত্যা; নির্যাতনে নেতৃত্ব প্রদান এবং এসবে অংশগ্রহণ; পাকিস্তান আর্মি, রাজাকার এবং শান্তি কমিটির লোকজন নিয়ে পারেরহাট বাজারে হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনের দোকানপাট লুটপাট, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ; এসব বাড়িঘর দোকানপাট লুটপাটে নেতৃত্বদান এবং সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগ; ভানু সাহাসহ বিভিন্ন মেয়েদের ধর্ষণ এবং ধর্ষণের উদ্দেশে গ্রামের নারীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে তুলে দেয়ার অভিযোগ এবং হত্যা, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে নিজে জড়িত থাকাসহ এসবে নেতৃত্ব প্রদান, পরিচালনা ও পাকিস্তান আর্মিকে এসব অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করার অভিযোগ।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে চার্জশিটে ৩২টি অভিযোগ জমা দেয়া হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। এখান সে সবের মধ্যে ২০টি অভিযোগ নিয়ে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এ ২০টি অভিযোগ হলো :

১। ১৯৭১ সালের ৪ মে মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে লোকজন পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে পিরোজপুর মাছিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে যায়। সেখানে পরিকল্পিতভাবে আগে থেকে লোকজন জড়ো করে ২০ জন নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

২। একই তারিখে মাওলানা সাঈদী ও তার দল পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে মাসিমপুর হিন্দুপাড়ায় যায়। সেখানে হিন্দুদের বাড়িঘর লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় পলায়নপর লোকজনের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলে ১৩ জন মারা যায়।

৩। একই দিন সাঈদী নিজে মাসিমপুর মনীন্দ্রনাথ ও সুরেশ চন্দ্র মণ্ডলের বাড়ি লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় আশপাশের আরো অনেক বাড়িতে আগুন ধরানো হয়।

৪। একই দিন সাঈদী তার রাজাকার বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে ধোপাবাড়ির সামনে এবং এলজিইডি ভবনের পেছনের হিন্দুপাড়া ঘিরে ফেলে। এ সময় তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলে দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডল, পলিন বিহারী, জগেন্দ্র মণ্ডল, মুকুন্দ বালা মারা যায়।

৫। পরের দিন ৫ মে সাঈদী ও তার সহযোগী শান্তি কমিটির মন্নাফ কয়েকজন পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ে পিরোজপুর হাসপাতালে যায়। সেখান থেকে তারা সাইফ মিজানুর রহমানকে ধরে বলেশ্বর নদীর তীরে নিয়ে যায়। সাইফ মিজানুর রহমান ছিলেন সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতা। একই দিন লেখক হুমায়ূন আহমেদের বাবা পিরোজপুরের সাবডিভিশন পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) ফয়জুর রহমান এবং ভারপ্রাপ্ত এসডিও আব্দুর রাজ্জাককে কর্মস্থল থেকে ধরে নিয়ে বলেশ্বর নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। মাওলানা সাঈদীর উপস্থিতিতে এ তিন সরকারি কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

৬। দুই দিন পর ৭ মে সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটির একটি দল পারেরহাট বাজারে হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের দোকানপাট ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। এরপর সেসব প্রতিষ্ঠানে নির্বিচারে লুটপাট চালানো হয়। পরে আগুন দেয়া হয়। মাখন লাল সাহার দোকান থেকে ২২ সের স্বর্ণ লুট করা হয়। মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটির লোকজন দোকানপাট লুটে অংশ নেয়।

৭। পরের দিন ৮ মে বেলা দেড়টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী নিয়ে বাদুরিয়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে শহিদুল ইসলাম সেলিম খানের বাড়িতে যায়। নুরুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে এবং পরে তাকে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়। এরপর তাদের বাড়ি আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

৮। একই দিন বেলা ৩টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে চিথলিয়া গ্রামে যায় এবং মানিক পসারীর বাড়ি লুট করে। এখানে পাঁচটি ঘর তারা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় লুটপাটের পর। মানিক পসারীর বাড়ি থেকে ইব্রাহীম কুট্টি ও মফিজুল নামে দুইজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সাঈদীর প্ররোচনায় ইব্রাহীমকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং মফিজকে সেনাক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।

৯। ২ জুন সকাল ৯টায় নলবুনিয়া গ্রামের আবদুল হালিমের বাড়িতে মূল্যবান জিনিস লুটপাটের পর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

১০। একই দিন সকাল ১০টার দিকে উমেদপুর গ্রামে সাঈদীর নেতৃত্বে ২৫টি ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ সময় সাঈদীর নির্দেশে বিশাবালী নামে একজনকে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে হত্যা করা হয়।

১১। একই দিন সাঈদী পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে টেংরাটিলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে যায়। তার বড় ভাই মাহবুবুল আলম হাওলাদারকে নির্যাতন এবং বাড়িতে লুটপাটের পর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

১২। সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল পারেরহাট বাজারের ১৪ জন হিন্দুকে এক দড়িতে বেঁধে গুলি করে হত্যার পর নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

১৩। যুদ্ধ শুরুর দু-তিন মাস পর সাঈদীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদল নলবুনিয়া গ্রামের আজহার আলীর বাড়িতে যায়। আজহার আলীর ছেলে সাহেব আলীকে পিরোজপুর নিয়ে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

১৪। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ৫০ জনের একটি রাজাকার দল হোগলাবুনিয়া গ্রামের হিন্দুপাড়ায় যায়। এখানে মহিলাদের ধর্ষণ করা হয় এবং তাদের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়।

১৫। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে সাঈদীর নেতত্বে ১৫-২০ জনের একটি দল হোগলাবুনিয়া গ্রামের ১০ জন হিন্দুকে ধরে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়া হয় এবং তাদের হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়।

১৬। সাঈদীর নেতৃত্বে পারেরহাট বাজারের গৌরাঙ্গ সাহার তিন বোনকে ধরে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দেয়া হয়। তিন বোনকে তিন দিন ক্যাম্পে আটকে রেখে ধর্ষণের পর ছেড়ে দেয়া হয়।

১৭। সাঈদী ও তার নেতৃত্বের রাজাকারেরা পারেরহাট বাজারের বিপদ সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে তার বাড়িতে আটকে রেখে নিয়মিত ধর্ষণ করত।

১৮। ভাগীরথী নামে একটি মেয়ে পাকিস্তান সেনা ক্যাম্পে কাজ করত। সাঈদী পাকিস্তানি সেনাদের খবর দেয় যে, ভাগীরথী মুক্তিযোদ্ধাদের চর হিসেবে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পের খবর মুক্তিযোদ্ধাদের পৌঁছে দেয়। এরপর পাকিস্তান সেনারা তাকে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়।

১৯। সাঈদী ১০০ থেকে ১০৫ জন হিন্দুকে জোর করে মুসলমান বানায় এবং তাদের মসজিদে নামাজ পড়তে বাধ্য করে।

২০। নভেম্বরের শেষের দিকে সাঈদী খবর পান মানুষজন ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। তার নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল ইন্দুরকানী গ্রামে তালুকদার বাড়িতে আক্রমণ চালায়। ৮৫ জনকে আটক করা হয়। ১০-১২ জন বাদ দিয়ে বাকিদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।

মামলার শুরু যেভাবে : মানিক পসারী নামে এক লোক পিরোজপুরের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ঘটনায় একটি মামলা করেন। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর মাহবুবুল আলম নামে আরেক ব্যক্তি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা করেন পিরোজপুর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে।

আসামিপক্ষ থেকে এ মামলা দু’টিকে রাজনৈতিক আখ্যায়িত করে ট্রাইব্যুনালে জানানো হয়, ২০০৯ সালে মাওলানা সাঈদীকে বিদেশ যেতে বাধা দান করা হলে হাইকোর্টে রিট করা হয়। কোর্ট তখন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে রায় দেন। রায়ের আধা ঘণ্টা পর হাইকোর্টের আদেশ চেম্বার জজ আদালতে স্টে করা হয়। হাইকোর্ট মাওলানা সাঈদীর পক্ষে রায় দেয়ার সময় বলেছিলেন সাঈদীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এ প্রসেঙ্গ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের সামনে বলেছিলেন মামলা নেই; কিন্তু মামলা হতে কতক্ষণ। তিনি এ কথা বলার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পিরোজপুরে তার বিরুদ্ধে মামলা হলো।

২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরে মামলার বাদি মাহবুবুল আলম হাওলাদার ২০১০ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে বিচার দাবি করেন। এভাবে মাওলানা সাঈদীর বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের অধীনে আসে এবং বিচারকার্যক্রম শুরু হয়।

তদন্ত সংস্থা ১৪ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় এবং ৩/১০/২০১১ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে আদেশ দেয়া হয় ট্রাইব্যুনাল-১-এ।

এর আগে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়াসংক্রান্ত একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয় মাওলানা সাঈদীকে।

সাক্ষী : মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৮ জন সাক্ষী হাজির করে। এর মধ্যে ঘটনার সাক্ষী ছিলেন ১৮ জন। বাকিদের একজন তদন্ত কর্মকর্তা এবং অন্যরা জব্দ তালিকার। রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৬৮ জন ঘটনার সাক্ষীর তালিকা জমা দিয়েছিল ট্রাইব্যুনালে। ৬৮ জনের মধ্য থেকে হাজির করা হয়নি এমন ১৬ জন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

অন্য দিকে আসামিপক্ষে মোট ২০ জন সাক্ষীর তালিকা নির্ধারণ করে দেন ট্রাইবু্যুনাল এবং তার মধ্য থেকে ১৭ জন সাক্ষী হাজির করে আসামিপক্ষ।

মাওলানা সাঈদীর পক্ষে মামলায় অংশ নেয়া আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম, মনজুর আহমেদ আনসারী, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন প্রমুখ।

আর মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের নির্ধারিত আইনজীবী ছিলেন সৈয়দ হায়দার আলী।

মাওলানা সাঈদীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় : মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৪০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সুবহে সাদিকের সময় পিরোজপুরের সাঈদখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মাওলানা ইউসুফ সাঈদী ছিলেন দেশের দণিাঞ্চলের সুপরিচিত ইসলামি চিন্তাবিদ ও বক্তা।

মাওলানা সাঈদী তার বাবার প্রতিষ্ঠিত দ্বীনি শিাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিা লাভ করার পর ১৯৬২ সালে মাদরাসা শিক্ষা শেষ করে গবেষণা কর্মে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৬৭ থেকে মাওলানা সাঈদী বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এবং বিশ্বের বহু দেশে মহাগ্রন্থ আল কুরআনের তাফসির করেছেন। কুরআন, হাদিস ও ইসলামের ওপর তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য পুস্তক; পেয়েছেন বিভিন্ন উপাধি, খ্যাতি ও সম্মান। তার তাফসিরের অডিও-ভিডিও পাওয়া যায় দেশে-বিদেশে। দেশে-বিদেশে সৃষ্টি হয়েছে তার অগণিত ভক্ত অনুরাগী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি মাওলানা সাঈদীর ওয়াজ মাহফিলে অংশ নিয়েছেন। বিশ্বের বহু দেশ থেকে নামকরা অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে তিনি সেসব দেশ সফর করেছেন এবং পবিত্র কুরআনের তাফসির করেছেন।

মাওলানা সাঈদী ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ১৯৮৯ সালে দলটির মজলিসে শূরার সদস্য হন। তিনি দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি তিন সন্তানের বাবা। ট্রাইব্যুনালে তার বিচার চলাকালে তার বড় ছেলে রাফীক বিন সাঈদী ইন্তেকাল করেছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।