নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের কৃষিকে লাভজনক খাতে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, কৃষিকাজ করে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় শ্রমিকরা ক্রমেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। ফলে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষিকে লাভজনক করার পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) পরিদর্শনকালে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
সভায় কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষকদের প্রণোদনা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষি গবেষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়লেও যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষকরা অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। উৎপাদনের পর পণ্য সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয়। এ সমস্যা সমাধানে সংরক্ষণ প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং এ খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলে প্রচুর আলু উৎপাদিত হলেও সেখানকার কৃষকরা সব সময় ন্যায্যমূল্য পান না। অনেক সময় দাম না পেয়ে কৃষকরা রাস্তায় আলু ফেলে দিতে বাধ্য হন। অথচ পরবর্তী সময়ে বীজ আলুর দাম বেড়ে যায়। আবার উৎপাদনস্থল থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর পর একই আলুর দাম অনেক বেড়ে যায়। অন্যান্য সবজির ক্ষেত্রেও এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্য এবং ভোক্তার ক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে ভোক্তাকেও বেশি দাম দিতে হয়। এ ব্যবধান কমাতে কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা উন্নত করা, সরবরাহব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো এবং সংরক্ষণের আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের তাগিদ:
কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ এবং কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি কমাতে আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, শুধু আলু নয়, টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফলমূল দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উপযোগী কোল্ড স্টোরেজ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে উৎপাদনের মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে কৃষকরা উপযুক্ত সময়ে পণ্য বাজারজাত করে ভালো দাম পেতে পারবেন। এতে কৃষির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে কৃষি অর্থনীতি শক্তিশালী হবে বলে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
পেঁয়াজ উৎপাদনে গবেষকদের সাফল্যের প্রশংসা:
পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষি গবেষকদের সাফল্যের প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, একসময় পেঁয়াজ আমদানিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হতো। বর্তমানে আমদানির প্রয়োজন না হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক অগ্রগতি।
কৃষি গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা যায়। এ জন্য গবেষকদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং কৃষকদের কাছে উন্নত জাত ও প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
রাষ্ট্রপতি ফলের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলোর সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ফলমূল ও শাকসবজির সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, কৃষক লাভবান হবেন এবং ভোক্তারাও সারা বছর বিভিন্ন পণ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ:
কৃষিজমিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, অতিরিক্ত সার মাটির ক্ষতি করছে এবং ফসলের গুণগত মান নষ্ট করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি টেকসই কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, কৃষির উন্নয়ন শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জমির উর্বরতা রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য উৎপাদনের দিকেও নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
কৃষকদের মাটির স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা, প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কৃষি বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান:
কৃষি গবেষণার উন্নয়ন ও মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করতে কৃষি বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, কৃষি বিজ্ঞানীরা যথাযথ সুযোগ-সুবিধা না পেলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হবে।
কৃষি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের কর্মপরিবেশ, পেশাগত নিরাপত্তা এবং প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি কৃষি বিজ্ঞানীদের পেনশন-সংক্রান্ত বিধিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে কৃষিমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতির মতে, কৃষির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করছে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর। তাই গবেষকদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি গবেষণায় নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে।
জিয়াউর রহমানের কৃষি উন্নয়নের উদ্যোগ স্মরণ:
সভায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৃষি উন্নয়নে অবদানের কথা স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, খাল খনন কর্মসূচি ও উচ্চফলনশীল ধানের বীজ সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি খাতে পরিবর্তন এনেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা, কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
বারি পরিদর্শন ও চারা রোপণ:
মতবিনিময় সভায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল করিম রনি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল কাদির এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বারির মহাপরিচালক স্বাগত বক্তব্য দেন এবং প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন। কৃষি গবেষণা, উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বারির ভূমিকা ও কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতি বারি প্রাঙ্গণে পৌঁছালে বাংলাদেশ পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।
পরিদর্শনের শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি বারির জিন ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রদর্শনী স্টল ঘুরে দেখেন। পরে তিনি উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ কেন্দ্র (পিজিআরসি) প্রাঙ্গণে বারি কাঁঠাল-৬ জাতের একটি চারা রোপণ করেন।
কৃষি খাতের উন্নয়ন, গবেষণার অগ্রগতি, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্রপতির এ বক্তব্য কৃষিকে আরও টেকসই ও লাভজনক করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় কমানো, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার এবং কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের কৃষি খাতকে আরও শক্তিশালী করার ওপর সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।


