Homeঅর্থনীতিশাপলা চত্বর হত্যা মামলা: শেখ হাসিনাসহ ৩০ পলাতক আসামিকে ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে...

শাপলা চত্বর হত্যা মামলা: শেখ হাসিনাসহ ৩০ পলাতক আসামিকে ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ ৩০ পলাতক আসামিকে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ জানিয়ে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

এ আদেশের মধ্য দিয়ে শাপলা চত্বরের বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করল।

এদিন মামলায় গ্রেফতার হওয়া ১০ আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। হাজির করা আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, দীপু মনি ও শামসুল হক টুকু, সাবেক সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরসহ অন্যরা। তবে অসুস্থ থাকায় সাংবাদিক ফারজানা রুপাকে এদিন আদালতে হাজির করা হয়নি।

আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গ্রেফতার আসামিদের আদালতে হাজির করা হয় এবং পলাতক আসামিদের বিষয়ে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আদেশ চাওয়া হয়।

ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী, মামলার ৩০ পলাতক আসামিকে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা আত্মসমর্পণ না করলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। পলাতক আসামিদের আদালতে হাজির হওয়ার বিষয়ে জনসাধারণকে অবহিত করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলার পলাতক আসামিদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।

এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র‍্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান এবং সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

পলাতক আসামিদের তালিকায় আরও রয়েছেন তৎকালীন র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন ও মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দফতর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ওসি বিএম ফরমান আলী।

এর আগে গত ২৭ জুলাই শাপলা চত্বরের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর পর মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ শুরু হয়। তাদের মধ্যে একাংশকে গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসামি এখনও পলাতক রয়েছেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ওই রাতে আসামিদের পারস্পরিক যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে রাতের আঁধারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল বলেও মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের দাবি, হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকদের নির্মূল করাই ওই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারাধীন এবং আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, শাপলা চত্বরের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬১ জন নিহতের তালিকা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা, ঘটনার সঙ্গে কার কী ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ধরন—এসব বিষয়ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় উঠে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মামলায় গ্রেফতার হওয়া অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবুসহ আরও কয়েকজন। বৃহস্পতিবার তাদের মধ্যকার গ্রেফতার আসামিদের একটি অংশকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের মামলায় একদিকে গ্রেফতার আসামিদের বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, অন্যদিকে পলাতক আসামিদের আদালতে হাজির করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশের ফলে পলাতক আসামিদের নিয়ে মামলার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

এখন নজর থাকবে—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পলাতক আসামিরা ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন কি না এবং আত্মসমর্পণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কী ধরনের পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়।

শাপলা চত্বরের ওই রাতের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিতর্ক থাকলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি চলমান হওয়ায় এখন সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়ার অপেক্ষায়

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments