নতুন রাস্তা নির্মাণের পর সেই রাস্তা কেটে নালা নির্মাণের আয়োজন, বাজারদরের প্রায় দ্বিগুণ দামে ডাস্টবিন কেনা, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে সরকারি কাজ থেকে বহিষ্কৃত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করা ঠিকাদারের জামানত বাজেয়াপ্ত না করার মতো নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন ‘নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন (আইইউজিআইপি)’ প্রকল্পে।
এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় নির্মাণকাজের মান, নকশা পরিবর্তন, সড়ক ও নালার পরিমাণ নির্ধারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরামর্শক নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের পৃথক প্রতিবেদনে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে বাস্তবায়নাধীন প্রায় ৬ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য দেশের পৌরসভা ও শহরাঞ্চলে নাগরিক সেবা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় উঠে আসা এসব অভিযোগে এর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নতুন রাস্তা কেটে নালা
প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভার চৌগাছা এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সড়ক ও নালা নির্মাণের কাজ আলাদা প্যাকেজে নেওয়া হয়। সড়ক নির্মাণের পর নালা নির্মাণ করতে গিয়ে দেখা যায়, নালা করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। পরে নতুন নির্মিত সড়ক কেটেই নালা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এতে একদিকে নতুন নির্মিত অবকাঠামো ফের কাটতে হচ্ছে, অন্যদিকে অনুমোদন ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় পার হয়েছে। ফলে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিগুণ দামে ডাস্টবিন কেনার অভিযোগ
প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রম নিয়েও অডিট আপত্তি উঠেছে। অস্বাভাবিক দামে নিম্নমানের ডাস্টবিন কেনা এবং যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সেগুলোর বিল পরিশোধের অভিযোগ করা হয়েছে। অডিট আপত্তিতে এ ঘটনায় সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৮ কোটি ৭৭ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০ লিটারের ২ লাখ ৫২ হাজার ডাস্টবিন কেনা হয়েছে। প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে ৬৮০ টাকা। এতে ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ১২০ লিটারের ২৫ হাজার ২০০টি ডাস্টবিন কেনা হয়েছে প্রতিটি ৬ হাজার ৮০০ টাকা দরে। এ ক্ষেত্রেও মোট ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অডিট ও বাজারদর যাচাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব ডাস্টবিনের ক্রয়মূল্য প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
বহিষ্কৃত ঠিকাদার পেল কাজ
ঠিকাদার নিয়োগেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে এমন এক ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে, যিনি ওই সময়ে সরকারি কাজ থেকে বহিষ্কৃত ছিলেন। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫০ লাখ ৩২ হাজার ৯৫৫ টাকা বলে অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্য একটি ঘটনায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ ঠিকাদারের জামানত বাজেয়াপ্ত না করে তাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারের ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৪০০ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরামর্শকদের কাজ নিয়েও প্রশ্ন
প্রকল্পে নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়েও আপত্তি উঠেছে। চুক্তি অনুযায়ী সরকারি স্থাপনা ব্যবহার করলেও সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অফিস ভাড়া পরিশোধ করেনি। এতে সরকারের ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৮০০ টাকা ক্ষতি হয়েছে।
এ ছাড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আয়কর না কাটায় আরও ৩৮ লাখ ৯৯ হাজার ৭১৭ টাকা ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচটি অডিট আপত্তিতে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১ কোটি টাকা।
এদিকে প্রকল্পে নিয়োজিত অনেক পরামর্শক নিয়মিত কাজ না করেও পারিশ্রমিক নিচ্ছেন—এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নির্মাণমান নিয়ে আইএমইডির প্রশ্ন
প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজের মান নিয়েও একাধিক ত্রুটি শনাক্ত করেছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সড়কের ঢাল ও বাঁকের উঁচু-নিচু নির্ধারণে অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এতে যান চলাচলের নিরাপত্তা এবং সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জমি দখল ও জায়গাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বিভিন্ন স্থানে নকশা পরিবর্তনের ঘটনাও পাওয়া গেছে। এসব পরিবর্তন যথাযথ পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি
কিছু এলাকায় নির্মাণকাজে পথচারীদের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতিও চিহ্নিত হয়েছে। কোথাও ফুটপাতের পাশে গভীর গর্ত থাকলেও নিরাপত্তাবেষ্টনী বা খুঁটি নেই। আবার কোথাও সড়কের পাশে রেলিং না থাকায় পথচারীদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে নালার গর্তের ঢাকনা নিরাপদ না হওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় নির্মিত কিছু অংশ ভেঙে গেলেও তা মেরামত করা হয়নি।
কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় উন্মুক্ত নালা থেকে দুর্ঘটনা, দুর্গন্ধ, মশার উপদ্রব ও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কালীগঞ্জে নির্মাণবর্জ্য নালার সঙ্গে যুক্ত স্থানে ফেলে রাখায় নালার কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার চিত্রও পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া সরকারের ইটের ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের কিছু নির্মাণকাজে ইট ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
প্রকল্পের পরিকল্পনাতেও অসঙ্গতি
আইইউজিআইপি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও অনুমোদিত কাজের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সড়ক এবং ৯০০ কিলোমিটার নালা নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও অনুমোদিত প্রকল্পে সড়কের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৭ দশমিক ৮১ কিলোমিটার এবং নালার পরিমাণ ৪৩৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার।
আবার প্রকল্পের যুক্তিকাঠামোতেও সড়ক ও নালার পরিমাণের ভিন্ন হিসাব পাওয়া গেছে। ফলে প্রকল্পের লক্ষ্য নির্ধারণ, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত কাজের পরিমাণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
প্রকল্পের আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন।
নারীর অংশগ্রহণের লক্ষ্যও পূরণ হয়নি
প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল নারী ও পুরুষের প্রয়োজন বিবেচনায় অবকাঠামো নির্মাণ এবং দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় কার্যক্রমে অন্তত ৫০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রতিবেদনে প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদককে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবের অভিযোগ
প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার জন্য তদবিরের অভিযোগও উঠেছে। প্রতিবেদকের দাবি, প্রকল্পের উপপরিচালক ইমতিয়াজ জহিরুল হক তাকে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি দাবি করেন, প্রকল্প পরিচালক তোফায়েল আহমেদ তাকে এ সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছেন। তবে প্রতিবেদক ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন বলে জানান। এ সংক্রান্ত কথোপকথনের রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য
এসব অনিয়মের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক তোফায়েল আহমেদ বলেন, অডিট আপত্তিগুলোর জবাব দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কোনো আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি; যাচাই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজের ক্ষেত্রে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।


