Homeজাতীয়শূন্য পাসের ১৫ প্রতিষ্ঠানের ৯টিই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, একজন পরীক্ষার্থী নিয়েও ফেল!

শূন্য পাসের ১৫ প্রতিষ্ঠানের ৯টিই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, একজন পরীক্ষার্থী নিয়েও ফেল!

নিজস্ব প্রতিবেদক:
কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় শূন্য পাসের হার পাওয়া ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯টিই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন হাতে গোনা, তেমনি শিক্ষার্থীদের পাসের হারও হতাশাজনক। কোনো প্রতিষ্ঠানে মাত্র একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। আবার কোথাও একজন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন চারজন শিক্ষক। কিন্তু এত শিক্ষক থাকার পরও ওই একজন শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ করাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থী সংকট ও ধারাবাহিক ফল বিপর্যয়ের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখা কি মূলত স্কুল শাখার ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে? নামমাত্র শিক্ষার্থী নিয়ে কলেজ শাখা পরিচালনার যৌক্তিকতা কতটুকু? শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শূন্য পাসের তালিকায় থাকা স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর অধিকাংশেই পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক থেকে সাতজনের মধ্যে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেনি। শিক্ষার্থীসংখ্যার তুলনায় শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এর একটি উদাহরণ কুমিল্লার লালমাই উপজেলার সুরুজ মেমোরিয়াল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে অংশ নিয়েছিল মাত্র একজন পরীক্ষার্থী। কলেজ শাখায় ওই একজন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক ছিলেন চারজন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই একজন পরীক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অর্থাৎ চারজন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও কলেজ শাখার ফলাফলে পাসের খাতা শূন্যই রয়ে গেছে।

এ বিষয়ে সুরুজ মেমোরিয়াল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক জোসনা আক্তার জানান, প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায় আগে ছয়জন শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষকসহ দুজন চলে গেছেন। বর্তমানে বাকি চারজন শিক্ষককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে কলেজ শাখা পরিচালনা করা হচ্ছে। এ বছর একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। তবে নতুন অনুমোদন পাওয়ার পর এ বছর তিনি ১১ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়েছেন বলে জানান।

শুধু সুরুজ মেমোরিয়াল নয়, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের শূন্য পাসের তালিকায় থাকা আরও আটটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের চিত্র প্রায় একই রকম। চাঁদপুর পৌর শহীদ জাবেদ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র একজন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার জিনোদপুর ইউনিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুইজন, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বগইর গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুইজন এবং লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের তোরাবগঞ্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে পরীক্ষার্থী ছিল দুইজন।

এ ছাড়া ফেনী সদর উপজেলার বেগম শামসুন্নাহার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে তিনজন, কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার প্রফেসর সিকান্দর আলী ভূঁইয়া গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাঁচজন, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে ছয়জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বীরগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের ফজু মিয়ার হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজে সাতজন করে পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানও শতভাগ অকৃতকার্যের তালিকায় রয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন ফলাফল শুধু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হতাশার কারণ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনব্যবস্থা, পাঠদানের মান, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে কলেজ শাখা পরিচালনা, পর্যাপ্ত পাঠদান হচ্ছে কি না এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার উপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের ভূমিকা কতটা কার্যকর—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, এত কমসংখ্যক পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ এবং শতভাগ অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি বোর্ডের নজরে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না কিংবা কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

অন্যদিকে, একই বোর্ডের অধীন কিছু প্রতিষ্ঠান শতভাগ পাসের সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীন মোট ৪৫৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শতভাগ পাস করেছে মাত্র চারটি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ, ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজ, কুমিল্লা সদর উপজেলার ময়নামতি ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মেঘনা উপজেলার মোজাফফর আলী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এবার এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ৯২ হাজার ১৬২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৪৪ হাজার ৭২৭ জন।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিংবা পাসের হার দিয়ে বিচার করা যায় না। তবে বছরের পর বছর শিক্ষার্থী সংকট, নামমাত্র পরীক্ষার্থী এবং শূন্য পাসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের মান ও পরিচালনব্যবস্থা পর্যালোচনা করা জরুরি। বিশেষ করে স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর ক্ষেত্রে স্কুল শাখার পাশাপাশি কলেজ শাখার বাস্তব কার্যকারিতা, শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষার্থী ভর্তি এবং পাঠদানের মান যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় শিক্ষার মানোন্নয়নের পরিবর্তে এসব প্রতিষ্ঠান কেবল নামসর্বস্ব কলেজ শাখা পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments