নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এম তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় চার দিনের পুলিশ রিমান্ড শেষে প্রধান সন্দেহভাজন আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে আরও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। মামলার রহস্য উদঘাটন, হত্যাকাণ্ডের স্থান শনাক্ত এবং জড়িত অন্যদের খুঁজে বের করতে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাত শুনানি শেষে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দীপকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আগের চার দিনের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে মামলার মূল রহস্য উদঘাটনে তিনি একাধিক প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং নীরবতা পালন করেছেন। তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে আরও বলা হয়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপ তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান। পরে তাহসিফ, দীপ ও মামলার আরেক সন্দেহভাজন আসামি জেরিকা তাসনিম দিশা (১৯) বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করেন। একপর্যায়ে দিশা বাসায় ফিরে যান।
দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তাহসিফ ও তিনি টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পৌঁছান। পরে তুরাগ নদীর তীরবর্তী একটি মাঠে যাওয়ার পর কয়েকজন লোককে দেখতে পেয়ে তারা আলাদা হয়ে যান।
সিসিটিভিতে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশের দৃশ্য
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে তাহসিফ ও তার বান্ধবীকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তারা একটি মোটরসাইকেলে সেখানে যান। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান দীপ।
পরে তিনজনই রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করেন। অন্য একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও তার বান্ধবী লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে দীপের জন্য অপেক্ষা করছেন। হেলমেট পরা অবস্থায় দীপ সেখানে পৌঁছালে তিনজন একসঙ্গে বারের লিফটে ওঠেন।
সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর তারা মোটরসাইকেলে করে বেরিয়ে যান। পরে তাহসিফের বান্ধবীকে তার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
যে আট কারণে রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ
দীপকে আরও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনে পুলিশ আটটি কারণ উল্লেখ করে। এর মধ্যে রয়েছে—সিসিটিভি ফুটেজ আসামির উপস্থিতিতে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ, নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে অবস্থানকালে দীপের ১৫ থেকে ২০ মিনিটের যোগাযোগের তথ্য অনুসন্ধান, তাহসিফ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য ও উদ্দেশ্য (মোটিভ) উদঘাটন, অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বা সংশ্লিষ্ট আলামত উদ্ধার এবং হত্যার স্থান নির্ধারণের জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ৩১ অক্টোবর উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। পরে তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ।
তাহসিফের মৃত্যুর আগে সর্বশেষ দীপ ও দিশার সঙ্গে তার অবস্থানের তথ্য সামনে আসায় তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত, কী কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং কোথায় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে—এসব বিষয়ে তদন্ত এখনো চলমান। মামলাটির তদন্ত করছে নৌ-পুলিশ।


