নিজস্ব প্রতিবেদক:
বন হওয়ার কথা ছিল বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। সরকারি নথিতে রয়েছে লাখ লাখ চারা রোপণ ও হাজার হাজার হেক্টর বনায়নের হিসাব। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গিয়ে সেই বনায়নের অস্তিত্ব নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। কোথাও নির্ধারিত এলাকার তুলনায় কম বনায়ন, কোথাও অল্পসংখ্যক গাছ, আবার কোথাও শুধু প্রকল্পের সাইনবোর্ড থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি গাড়ি, ফটোকপি মেশিন, মোটরসাইকেল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও আসবাব কেনা, বনভবন সংস্কার এবং টিস্যু কালচার ল্যাব স্থাপনেও বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বন অধিদপ্তরের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ‘টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল)’ প্রকল্প ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন অধিদপ্তরে অভিযান চালিয়ে নথিপত্র সংগ্রহ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে নথিপত্র সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই চলছে বলে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, সুফল প্রকল্পের আওতাধীন কিছু এলাকায় বাস্তবে বনায়ন না করেই অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও সীমিত পরিসরে চারা রোপণ করা হয়েছে, আবার কোথাও শুধু সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলেও বাগানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনীয় পরিচর্যার অভাবে রোপণ করা চারার একটি অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সুফল প্রকল্পের আওতায় বিপুল পরিমাণ জমিতে বনায়নের হিসাব দেখানো হলেও বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কক্সবাজারের রামুর জোয়ারিয়ানালা বিটের একটি হিসাব নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫১০ হেক্টর বনায়নের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাস্তবে প্রায় ১৬০ হেক্টরে বনায়ন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নথির হিসাব ও মাঠপর্যায়ের চিত্রে বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ রয়েছে।
তবে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতির আক্রমণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা চারার স্বাভাবিক মৃত্যুকে বনায়নের ঘাটতির কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ রয়েছে। ফলে প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে সাইটভিত্তিক রেকর্ড, রোপণের ছবি, অবস্থান-তথ্য, রক্ষণাবেক্ষণ রেজিস্টার এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের নথি যাচাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের যানবাহন কেনাকাটাতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সুফল প্রকল্পের জন্য চারটি ফোর্ড পিকআপ প্রায় ৫৭ লাখ টাকা করে কেনা হয়। একই ধরনের গাড়ি অন্য একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় ৪৭ লাখ টাকা দরে কেনার তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে চারটি গাড়িতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে গাড়ির মডেল, কারিগরি বৈশিষ্ট্য, কর-শুল্ক, দরপত্রের শর্ত এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার নথি যাচাই প্রয়োজন।
প্রকল্পের আওতায় ১২৮টি ফটোকপি মেশিন কেনার ক্ষেত্রেও প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতি ইউনিটের ক্রয়মূল্য, বাজারদর, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠান, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং সরবরাহ-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
মোটরসাইকেল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও অফিস আসবাব কেনাকাটায় প্রায় ৩৭ কোটি ১৬ লাখ ১৬ হাজার টাকার অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এসব ক্রয়ের কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, সরবরাহ প্রতিবেদন, গ্রহণপত্র ও বাজারমূল্যের তুলনামূলক হিসাব যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
মহাখালীর বনভবন সংস্কারের নামেও প্রায় ৮ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার টাকার অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। সংস্কারকাজের প্রাক্কলন, দরপত্র, কার্যাদেশ, কাজের পরিমাপ, ঠিকাদারের বিল এবং চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধের নথি যাচাই করা হলে প্রকৃত কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের সঙ্গে দাবির সামঞ্জস্য নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও যশোরে তিনটি টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি স্থাপনে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ল্যাবের উদ্দেশ্য ছিল উন্নত ও রোগমুক্ত চারা উৎপাদন। কিন্তু ব্যয় অনুযায়ী প্রত্যাশিত চারা উৎপাদন হয়েছে কি না, ল্যাবের যন্ত্রপাতি কতটা ব্যবহার হয়েছে, জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা কেমন—এসব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পের জাতীয় বন জরিপে প্রায় ১৭ কোটি টাকা, নন-ডেট্রিমেন্টাল ফাইন্ডিংস কার্যক্রমে প্রায় ৪ কোটি টাকা এবং সহায়তাপ্রাপ্ত প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম বা এএনআর কার্যক্রমে প্রায় ১৬ কোটি ৩৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সমৃদ্ধকরণ বাগান সৃজনে প্রায় ৫০ কোটি টাকা এবং অ-কাঠ বনজ পণ্যভিত্তিক বাগান তৈরিতে প্রায় ১৩ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু এলাকায় বাস্তবে বাগান না করেই কাগজে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
প্রকল্পটির ক্রয় ও বাস্তবায়ন ঘিরে কয়েকজন বন কর্মকর্তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে তৎকালীন বন মন্ত্রণালয় ও বন অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় থাকার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের একাংশ প্রকল্পের অর্থ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন ভাগাভাগির দাবি করেছেন এবং এতে তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক, প্রকল্প পরিচালক ও তৎকালীন বনমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নাম এনেছেন।
তবে এটি অভিযোগমাত্র; এর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার যাচাই ও প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সুফল প্রকল্প নিয়ে দুদকের তৎপরতা শুরু হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন অধিদপ্তরে অভিযানের মাধ্যমে। পরে প্রকল্পসংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র তলব করে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই চলছে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে দুদকের অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


