Homeজাতীয়মানচিত্রে ১৬ নদী, অস্তিত্ব সংকটে ১৪

মানচিত্রে ১৬ নদী, অস্তিত্ব সংকটে ১৪

শাহিন জামান, লালমনিরহাট:
লালমনিরহাটে সরকারি তালিকায় নদী ১৬টি। বাস্তবে তিস্তা ও ধরলা ছাড়া বাকি ১৪টি নদীই অস্তিত্ব সংকটে। দখল, দূষণ, পলি জমে ভরাট ও অবৈধ বালু উত্তোলনে কোথাও নদী নেমে এসেছে কয়েক ফুটে, কোথাও পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। একসময় যে নদীগুলো ছিল জনজীবন ও কৃষির প্রাণ, সেগুলো এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।

২০২৫ সালে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের করা তালিকা অনুযায়ী জেলার ১৬টি নদী হলো গিদারি, চেনাকাটা, টেংরামারী, মরাসতী, রত্নাই, ভাটেশ্বরী, স্বর্ণামতী, সতী, সানিয়াজান, সিংগীমারী, কোটেশ্বর, খাটুমারা, সাঙ্গুলী, খেংটি, তিস্তা ও ধরলা।

এর মধ্যে তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান, গিদারি, টেংরামারী, সাঙ্গুলী, খেংটি ও মালদহ আন্তসীমান্ত নদী হিসেবে পরিচিত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বছরের পর বছর ময়লা-আবর্জনা ও কচুরিপানা জমে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। আবার কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবর্তিত হয়েছে নদীর গতিপথ। পলি জমে ভরাট হয়ে অনেক নদী এখন সরু খাল কিংবা নালায় পরিণত হয়েছে।

উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি না আসা, স্থানীয়ভাবে দখল ও দূষণ এবং দীর্ঘদিন পুনঃখনন না হওয়াকে নদীগুলোর বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তিস্তার আন্তঃশাখা নদী সতীর অবস্থাই সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ। হাতীবান্ধা উপজেলার পারুলিয়া এলাকায় তিস্তা থেকে উৎপন্ন হয়ে আদিতমারী হয়ে সদর উপজেলায় আবার তিস্তায় মিলিত হয়েছে নদীটি।

একসময় সতী নদীর গড় প্রস্থ ছিল প্রায় ৫০০ ফুট। কিন্তু দখল ও ভরাটের কারণে লালমনিরহাট শহরের বাসস্ট্যান্ডের কিছুটা উজানে নদীটি সংকুচিত হয়ে মাত্র ৫ থেকে ৭ ফুটে পরিণত হয়েছে।

নদীটির বিভিন্ন অংশে দখল ও ভরাটের কারণে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত দখল উচ্ছেদ ও নদী পুনরুদ্ধারে ব্যবস্থা না নিলে সতী নদীটি অচিরেই পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।

পাটগ্রাম উপজেলার সিংগীমারী নদীর চিত্রও একই। বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন নদীর বিভিন্ন অংশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমেছে। সেই আবর্জনায় ধীরে ধীরে নদীর অংশবিশেষ ভরাট হচ্ছে। এরপর ভরাট জায়গায় চলছে দখল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো দখলের সঙ্গে নতুন দখলদাররাও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। নদীর জায়গায় স্থাপনা গড়ে উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।

বুড়িমারী স্থলবন্দরের দিকে যাওয়ার পথে কয়েক কিলোমিটার সড়ক নদীটির পাশ দিয়ে গেছে। সীমান্তবর্তী এ নদীর এক পাশে ভারতের চা-বাগান। অথচ পাটগ্রাম বাসস্ট্যান্ডের কাছে নদীটির বড় একটি অংশ দখল ও আবর্জনায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

লালমনিরহাটের প্রধান নদী তিস্তাও রয়েছে সংকটে। উজানের পানি প্রত্যাহার, দীর্ঘদিনের পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়া এবং নদীর ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষায় দেখা দেয় বন্যা ও ভাঙন।

পানি বাড়লে নদীর দুই তীরের মানুষের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি প্লাবিত হয়। আবার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও কোথাও শুরু হয় নদীভাঙন। এতে প্রতিবছরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তিস্তাপারের মানুষ।

বন্যা ও নদীভাঙন থেকে তিস্তাপারের মানুষকে রক্ষায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি দীর্ঘদিনের। তবে এখনো তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

লালমনিরহাটের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী ধরলাতেও রয়েছে ভাঙন। নদীটি বাংলাদেশে একাধিকবার প্রবেশ করেছে। বুড়িমারী স্থলবন্দরের পাশ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আবার ভারতে চলে গেছে। পরে পাটগ্রাম দিয়ে পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে কুড়িগ্রাম হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে।

ধরলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের রেল যোগাযোগের ইতিহাস। সদর উপজেলার মোগলহাট ধরলাপাড়ে এখনো পুরোনো রেলস্টেশনের চিহ্ন রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় পুরোনো রেলসেতুটিও নদীটির অতীত যোগাযোগব্যবস্থার সাক্ষী হয়ে আছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন সমীক্ষাতেও লালমনিরহাটের নদীগুলোর সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

স্থানীয় পরিবেশবাদীদের মতে, নদী রক্ষায় শুধু দখল উচ্ছেদ করলেই হবে না। নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল বন্ধ, ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ, অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় স্থানে পুনঃখনন করতে হবে। একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে জেলা নদী রক্ষা কমিটিকে।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, কোনো ব্যক্তির এসব নদীর জমির মালিকানা হওয়ার সুযোগ ছিল না। যে সূত্রেই ব্যক্তিমালিকানা হয়ে থাকুক, তা অবৈধ। প্রথমেই এসব মালিকানা বাতিল করতে হবে। জমির খাজনা-খারিজ বন্ধ করার পাশাপাশি অবৈধভাবে দখল হওয়া নদীর জমি উদ্ধারে স্থানীয় নদী রক্ষা কমিটিকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, নদীগুলো দখলমুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সংকটাপন্ন নদীগুলো পরিষ্কার ও পুনঃখননের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments