Homeজাতীয়‘হত্যার পর মৃতদেহ বস্তায় বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়’

‘হত্যার পর মৃতদেহ বস্তায় বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়’

র‌্যাবের বেশ কিছু কর্মকর্তা গুমের পর দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে হত্যা করে পেট কেটে, সিমেন্টের বস্তায় বেঁধে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দিতেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষীদের জবানবন্দিতে এমন ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের তথ্য উঠে আসে।

জবানবন্দির তথ্য পর্যালোচনা করে  যায়, লাশ যেন পানির নিচে দ্রুত ডুবে যায় বা ভেসে না ওঠে সেজন্য ধারালো ছুরি দিয়ে পেট কেটে দেওয়া হতো। লাশের সঙ্গে ভারী ইটের টুকরো বা সিমেন্টের বস্তা শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হতো। রাতের অন্ধকারে লাশগুলো বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

সাক্ষ্যে আরও উঠে এসেছে, বন্দিদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সরকারি নথি ধ্বংস এবং হত্যাকাণ্ডের সময় ভুক্তভোগীদের পরিচয় গোপন রাখার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তদন্ত সংস্থা তদন্ত চালালেও বহু ভুক্তভোগীর পরিচয় আজও অজানা রয়ে গেছে।

একাধিক ঘটনায় নদীতে নামহীন লাশ ফেলে দেওয়ার ধরনও চিহ্নিত হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলা ও অভিযোগের বিচার কার্যক্রম চলছে।

দল হিসাবে বিএনপি ও জামায়াত এবং ভুক্তভোগীদের পরিবার এসব অপরাধের অভিযোগ করেছে। দল দুটির তিন হাজারের বেশি নেতাকর্মী ও ব্যক্তিকে গুম ও খুনের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, র‌্যাব ও পুলিশের সাবেক সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম চলছে। সাক্ষ্যগ্রহণে আসামিদের বিরুদ্ধে সে সময়ে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার দুঃসহ বর্ণনা উঠে এসেছে।

বর্তমানে চারটি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে এবং দুটি মামলা অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে। মামলা চারটি হচ্ছে- টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল (টিএফআই সেল), জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি)। মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুমের মামলা ছাড়াও ছাত্রদল-জাসাসের দুই নেতাকে ক্রসফায়ার হত্যার মামলা রয়েছে।

প্রসকিউশন জানিয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে টিএফআই ও জেআইসি সেল ব্যবহার করে গুম খুনের তিন মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে রায় আসতে পারে। জিয়াউল ছাড়াও টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট আসামি ১৭ জন।

অন্যদিকে জেআইসি সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় আরেক মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ আসামির বিচার চলছে। অন্যদিকে, কল্যাণপুরে জাহাজ বাড়িতে ‘জঙ্গি নাটক সাজিয়ে’ ৯ তরুণকে হত্যা এবং গাজীপুরের পাতারটেক এলাকায় কথিত ‘জঙ্গি আস্তানা’ নাটক সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার ঘটনায় দুই মামলায় অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী শনিবার বলেন, টিএফআই সেল ও জেআইসি এই দুই মামলায় সাতজন করে ১৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এ পর্যায়ে জিয়াউল আহসানের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ৯ জন। আশা করা যায়, চলতি বছরের মধ্যে এ মামলাগুলোর বিচার নিষ্পত্তি হবে।

তিনি বলেন, গুমের মামলাগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একজন সাক্ষীকে ১৭ জন আসামির আইনজীবী জেরা করেন। এতে করে সময় লাগছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষকে জেরার জন্য যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম, ক্রসফায়ার ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তিন হাজার ২৯৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবিতে গত ১২ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনটি পৃথক আবেদন করে বিএনপি।

বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামকে এসব বিষয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে দলটি। চিফ প্রসিকিউটরের কাছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সালাহ উদ্দিন খান এই আবেদনগুলো করেন।

টিএফআই সেল : এ সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জন আসামি। এর মধ্যে ১০ জন গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন-ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম। এ মামলায় শেখ হাসিনা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ সাত আসামি পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

জেআইসি : এ সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ জন আসামি। এর মধ্যে তিন আসামি গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন- প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামি পলাতক। ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এ মামলায় সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

জিয়াউল আহসান : আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় ১৪ জানুয়ারি করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। এ মামলায় এ পর্যন্ত ৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

ছাত্রদল-জাসাসের দুই নেতাকে ক্রসফায়ার : ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ক্রসফায়ারের শিকার হন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা। এ মামলায় চার আসামি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) একেএম এহসানউল্লাহ পলাতক। অপর দুই আসামি বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

বস্তা বেঁধে গুলি করে নদীতে ফেলা হয় ভুক্তভোগীকে : আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মামলায় জবানবন্দি দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক। গত ৩০ জুলাই ট্রাইব্যুনালে সুন্দরবনের একটি অভিযানের বর্ণনা দিয়ে মনিরুল হক বলেন, র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার নেতৃত্বে সেই অভিযানে চোখ-হাত বাঁধা একজনকে নৌকার কিনারায় নিয়ে তার শরীরের সঙ্গে ভারী বস্তা বেঁধে গুলি করেন। সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন গুলিবিদ্ধ লোকটিকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর তাকে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল : গুম করে রাখার মামলার গত ১৩ আগস্ট জবানবন্দি দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের আশিক উল আকবর। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ডাকে শাপলা চত্বরের সমাবেশে তিনি এসেছিলেন। শাপলা চত্বরের ওই ঘটনার পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসিনা ও তার ফ্যাসিস্ট সরকার এবং ভারতবিরোধী বিভিন্ন পোস্ট করতেন। এ অবস্থায় ২০১৬ সালের ২৩ মে রাতে মামার বাড়ি গাজীপুরের টঙ্গী থেকে সাদা পোশাকধারীরা তাকে তুলে নেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments