Homeজাতীয়বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট সমাধানে জামায়াতের চার প্রস্তাব

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট সমাধানে জামায়াতের চার প্রস্তাব

সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ, সরকার-বিরোধী দলের টাস্কফোর্স, চুরি-দুর্নীতি বন্ধ ও সঠিক পরিকল্পনার তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করেছে বিরোধী দল। বিএনপি সরকারের মেয়াদের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এমন বড় কর্মসূচি পালনের যৌক্তিকতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা থাকলেও সংকট মোকাবিলায় নিজেদের বিকল্প পরিকল্পনা তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামী।

দলটির নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় চারটি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—শিল্পকারখানাগুলোকে উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়া, সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স সেল গঠন, সিস্টেম লসের নামে বিদ্যুৎ চুরি ও দুর্নীতি বন্ধ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি চাঁদা ও কমিশননির্ভর মানসিকতা পরিহার করা।

জামায়াত নেতারা বলছেন, এসব প্রস্তাব ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদেও উত্থাপন করা হয়েছে। তাদের মতে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে দেশীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের ভাষায়, সমস্যার সমাধানে কোনো ‘জাদু’ নেই; প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও এর সমাধান নিয়ে দলের আমির ও সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন জাতীয় সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিই এ বিষয়ে দলের পূর্ণাঙ্গ অবস্থান।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চুরি ও দুর্নীতি বন্ধ করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তার অভিযোগ, সঠিক পরিকল্পনার অভাবেই দেশে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, কোনো পরিকল্পনা গ্রহণের সময় যদি দেশের প্রয়োজনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে তা কখনোই জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনা হতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, সংসদ ও সংসদীয় কমিটিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমেও দলের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারকে সহযোগিতা এবং সংকট মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, সরকার গঠনের পরপরই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তাদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সেগুলো যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

তার মতে, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা হলে লংমার্চের ছয় দফা দাবির মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি এভাবে সামনে আনতে হতো না।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের সংসদীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই—এমন অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, সরকারের পদক্ষেপে তারা আশাবাদী হতে চান। তবে সংসদে দেওয়া আশ্বাস বাস্তবে প্রতিফলিত না হলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মিটার চার্জ ও ডিমান্ড চার্জ না নেওয়ার কথা বলা হলেও তা নেওয়া হচ্ছে এবং ‘ভূতুড়ে বিলের’ সমস্যাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

ডা. শফিকুর রহমানের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে যত ভালো পরিকল্পনাই নেওয়া হোক, তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

তিনি বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েও প্রশ্ন তুলে এর কার্যকর সমাধানের দাবি জানান। তার ভাষায়, এ ধরনের একটি ‘দুষ্টচক্র’ থেকে দেশকে বের করে আনতে হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে জাতীয় সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, একটি দেশ যখন পাওয়ার ক্রাইসিসে ভোগে, তখন দেশটি কার্যত ‘পাওয়ারলেস’ হয়ে পড়ে। তারা চান না বাংলাদেশের মানুষ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হোক।

সংকট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, সরকার চাইলে তাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমকে সরকারের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

জামায়াতের নেতাদের বক্তব্য ও সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাবের আলোকে সংকট মোকাবিলায় তাদের মূল পরিকল্পনা চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো—

. সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ: শিল্পকারখানাগুলোকে উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়া।

. যৌথ টাস্কফোর্স: সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর টাস্কফোর্স সেল গঠন।

. চুরি দুর্নীতি বন্ধ: সিস্টেম লসের আড়ালে বিদ্যুৎ চুরি, অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

. দীর্ঘমেয়াদি সঠিক পরিকল্পনা: দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং চাঁদা-কমিশননির্ভর মানসিকতা পরিহার করা।

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের বিকল্প পরিকল্পনাও সামনে আনতে চাইছে জামায়াতে ইসলামী। এখন এসব প্রস্তাব কতটা বাস্তবসম্মত এবং সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে—তা নিয়েই নজর থাকবে রাজনৈতিক ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট মহলের।

 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments