Homeজাতীয়আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
নিয়োগ-পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন এবং বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সংস্থাটির কাছে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখিত বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের অঙ্ক যোগ করলে অভিযোগের মোট পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগ বিদেশে অর্থপাচার সংক্রান্ত। দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে ভিলা কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুদক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয়। অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা ও আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছে দুদক।

অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে উল্লেখিত অঙ্ক অনুযায়ী, ৩৬ জনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য লেনদেনের পরিমাণ ৭২ কোটি থেকে ৩৬০ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি সত্য কি না, তা অনুসন্ধানের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গেও আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রকল্পের বরাদ্দ ও অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি এলজিইডির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিইও হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতেও কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে বিদেশে অর্থপাচারের অঙ্কই সবচেয়ে বেশি। অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব অর্থ দিয়ে বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

এ ছাড়া আসিফ মাহমুদের দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের দাবিও করা হয়েছে।

অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে।

তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি হেলিকপ্টারে কম্বল বিতরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় এবং বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের ঘটনাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহারের বিষয়েও অভিযোগে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ওই অনুসন্ধানে সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের নামও রয়েছে।

আগের অভিযোগে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল ও পদায়নের মাধ্যমে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতিতে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছিল।

এ ছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের টেন্ডার, কেনাকাটা ও অন্যান্য কার্যক্রমে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। বিষয়টি অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি টিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, আগের অভিযোগের সঙ্গে নতুন করে পাওয়া অভিযোগগুলো সংযুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ-পদায়ন এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ থাকায় বিষয়টি বড় পরিসরে যাচাই করা হবে।

তবে দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ ও বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য যাচাই করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments