Homeজাতীয়কুমিল্লার ঐতিহ্য ‘রসে ভরা’ খেজুর গাছ এখন অস্তিত্ব সংকটে

কুমিল্লার ঐতিহ্য ‘রসে ভরা’ খেজুর গাছ এখন অস্তিত্ব সংকটে

মশিউর রহমান সেলিম, কুমিল্লা:
শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে প্রকৃতিতে হাজির হচ্ছে হেমন্ত। কার্তিকের শেষ প্রান্তে এসে গ্রামবাংলায় শুরু হয়েছে খেজুর গাছ পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। একসময় কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে শীত মানেই ছিল খেজুরের রস, গুড় আর পিঠা-পুলির উৎসব। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই চিরচেনা দৃশ্য। নির্বিচারে গাছ কাটা, নতুন করে খেজুর গাছ রোপণে অনীহা এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে কুমিল্লার লাকসাম, নাঙ্গলকোট, লালমাই ও মনোহরগঞ্জসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলায় খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস এখন অনেকটা সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, একসময় এসব উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রাম, সড়কের পাশ, বাড়ির আঙিনা, ফসলি জমির আইল ও মাঠের মধ্যে অসংখ্য খেজুর গাছ দেখা যেত। শীত মৌসুমে গাছিরা দল বেঁধে এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেন। এখন দুই থেকে চারটি গ্রাম ঘুরেও পর্যাপ্ত খেজুর গাছের সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে পৈতৃক পেশা ধরে রাখা গাছিরাও পড়েছেন নানা সংকটে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দক্ষিণ কুমিল্লার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় খেজুর গাছের পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের জন্য গাছের মাথা পরিষ্কারের কাজ প্রায় শেষ করেছেন গাছিরা। কোমরে মোটা রশি বেঁধে ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠে তাঁরা রস সংগ্রহের উপযোগী করে গাছ প্রস্তুত করছেন। কার্তিক মাসের শুরু থেকেই এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে এখনো শীতের তীব্রতা সেভাবে না বাড়ায় অনেক গাছ থেকে রস সংগ্রহ শুরু করা সম্ভব হয়নি। গাছিরা আশা করছেন, অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘ মাসে শীতের প্রকোপ বাড়লে রসের পরিমাণ ও মিষ্টতা দুটোই বাড়বে।

পেশাদার গাছিদের পাশাপাশি স্থানীয় অনেক উৎসাহী মানুষকেও রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিতে দেখা যাচ্ছে। তবে গাছের সংকটের কারণে আগের মতো পর্যাপ্ত রস সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। তারপরও পৈতৃক পেশার প্রতি ভালোবাসা ও জীবিকার তাগিদে গ্রামে গ্রামে ঘুরে খেজুর গাছ খুঁজছেন তাঁরা।

স্থানীয় গাছিরা জানান, খেজুর গাছ কাটা ও পরিচর্যার কাজ বেশ কষ্টসাধ্য। কোমরে রশি বেঁধে উঁচু গাছে উঠে গাছের মাথা পরিষ্কার করা এবং নির্দিষ্ট স্থানে কেটে হাঁড়ি বসাতে হয়। এরপর প্রতিদিন নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। তবে এই পরিশ্রমের মধ্যেও রয়েছে আনন্দ। কারণ, শীতের সকালে সংগৃহীত তাজা খেজুরের রস বিক্রি করে পরিবারের বাড়তি আয় হয়।

লাকসাম, নাঙ্গলকোট, লালমাই ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গাছি সেলিম মিয়া, জামাল হোসেন, রফিকুল ইসলাম, সামছুল ইসলাম ও গনি মিয়া জানান, কয়েক বছর ধরে তাঁরা এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। রস সংগ্রহ করে বিক্রি করেই পরিবারের অনেক চাহিদা পূরণ করেন। প্রতি কলস খেজুরের রস ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করার আশা করছেন তাঁরা। তবে প্রকৃত দাম নির্ভর করবে রসের পরিমাণ, গুণগত মান ও স্থানীয় বাজারের ওপর। তাঁদের ভাষ্য, শীত যত বাড়বে, রস তত বেশি মিষ্টি হবে এবং সংগ্রহের পরিমাণও বাড়বে।

খেজুরের রস শুধু পানীয় হিসেবেই নয়, গ্রামবাংলার খাদ্যসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন আমন ধান ঘরে ওঠার পর খেজুরের রস দিয়ে পিঠা, পুলি, পায়েশসহ নানা ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। এ ছাড়া রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড়। সেই গুড় দিয়ে মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া ও অন্যান্য মুখরোচক খাবার তৈরি করেন গ্রামীণ পরিবারের সদস্যরা। শীতের সকালে খেজুরের কাঁচা রস পান করার আনন্দও গ্রামবাংলার মানুষের কাছে এক বিশেষ অনুভূতি।

কিন্তু খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এসব ঐতিহ্য। শুধু রস ও গুড়ের স্বাদ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গাছিদের পেশা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং লোকজ সংস্কৃতিও এখন হুমকির মুখে।

স্থানীয় পরিবেশসচেতন ব্যক্তিদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় সড়ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণসহ নানা কারণে সড়কের পাশের পরিবেশবান্ধব গাছ কাটা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে গাছ রোপণ ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তাঁদের মতে, খেজুর গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় এ অঞ্চলে গাছের সংখ্যা ক্রমেই কমছে।

পরিবেশসচেতন মহল মনে করেন, খেজুর গাছ রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। সড়কের পাশে, সরকারি খাসজমি, পতিত জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা এবং গ্রামীণ রাস্তার দুই পাশে পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণ, গাছিদের প্রশিক্ষণ এবং খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনে উৎসাহিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাঁদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী প্রজন্মের কাছে খেজুর গাছ, শীতের টাটকা রস ও খেজুরের গুড় কেবল গল্পের বিষয় হয়ে থাকবে। গ্রামবাংলার এই মধুবৃক্ষ হারিয়ে গেলে এর সঙ্গে হারিয়ে যাবে শীতের এক অনন্য ঐতিহ্য।

এ বিষয়ে স্থানীয় বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments