নিজস্ব প্রতিবেদক:
হরমুজ প্রণালিতে দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে আইআরজিসির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আইআরজিসির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ও সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা অভিযান চালানো হয়। তবে ইরানের দাবি করা এসব হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে দুটি মার্কিন জাহাজসহ বেশ কয়েকটি জাহাজকে লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। পাশাপাশি আরও ১০টি ‘নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজ’কে লক্ষ্য করার দাবিও করেছে তারা।
ইরানের অভিযোগ, এসব জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ও প্ররোচনায় হরমুজ প্রণালির একটি ‘নিষিদ্ধ ও অনিরাপদ এলাকায়’ প্রবেশের চেষ্টা করছিল। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় আগে থেকেই জাহাজ চলাচল নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা দ্রুত সামরিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। এর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে তারা কয়েকটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এসব হামলায় পাঁচটি ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে।
এর আগে আইআরজিসি দুটি মার্কিন নৌযানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র হামলার বিষয়টি স্বীকার করলেও জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানেনি এবং কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ইরান আরও কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করার দাবি করে। তেহরান এসব জাহাজকে ‘অননুমোদিত’ পথে চলাচলকারী হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আইআরজিসি বলেছে, হরমুজ প্রণালি এখনো তাদের ‘শক্তিশালী ও কর্তৃত্বপূর্ণ নজরদারি ও ব্যবস্থাপনার’ আওতায় রয়েছে। প্রণালির নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছে ইরান।
এর আগে আইআরজিসি হরমুজ প্রণালির কথিত ‘অননুমোদিত’ রুট ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করেছিল। সেপ্টেম্বরে ইরানি বাহিনী দুটি তেলবাহী ট্যাংকার মাইন বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবিও করেছিল এবং জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছিল।
চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে প্রণালিটি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ৮ সেপ্টেম্বর মাত্র ছয়টি কমোডিটি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে, যা আগের দিনের নয়টির তুলনায় কম এবং ১০ দিনের গড় ১২টিরও নিচে।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে সংঘাতের প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি উঠে গেছে।
ইরানের আইআরজিসি দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার যে দাবি করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এর আগে ইরানের বিভিন্ন হামলার দাবির ক্ষেত্রেও মার্কিন পক্ষ ভিন্ন তথ্য দিয়েছে বা তা অস্বীকার করেছে। ফলে জাহাজগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি, হতাহতের সংখ্যা এবং হামলার সুনির্দিষ্ট স্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেতে আরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।


