মিজানুর রহমান, নাটোর প্রতিনিধি:
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জুঁই খাতুনের বয়স তখন মাত্র সাত মাস। যে বয়সে একটি শিশুর হাসি-খেলায় মুখর থাকার কথা, সেই বয়সেই জটিল কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় সে। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১৫ বছর। একের পর এক হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে কিশোরীটি। এখনো কিডনিসহ নানা জটিল রোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে সে।
জুঁই বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকগোয়াস (কুলপাড়া) গ্রামের জুব্বার আলী ও রিনা বেগম দম্পতির মেজ মেয়ে। বর্তমানে সে বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
সহপাঠীরা যখন বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে মেতে ওঠে, তখন অসুস্থতার কারণে ঘরেই কাটাতে হয় জুঁইকে। শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি সে।
শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের থলিতে প্রস্রাব আটকে থাকা, পেট ফুলে থাকা, বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি না হওয়া, রাতে ঘুমাতে না পারা ও শ্বাসকষ্ট—সব মিলিয়ে অসহনীয় কষ্টের জীবন পার করছে কিশোরী জুঁই।
অসুস্থ জুঁই ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলে, তার পেট ফুলে গেছে, পাশে ও পেটে ব্যথা করে। সে ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে পারে না। ভালো হয়ে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে খেলতে, বেড়াতে ও স্কুলে যেতে চায় সে। সুস্থ হওয়ার জন্য সবার কাছে দোয়া ও সাহায্য চেয়েছে জুঁই।
জুঁইয়ের মা রিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জুঁইয়ের বয়স যখন মাত্র সাত মাস, তখন থেকেই সে অসুস্থ। তার পেট ফুলে যায়, তীব্র পেটব্যথা হয়, চোখ-মুখ ফুলে যায় এবং প্রস্রাবে বারবার সংক্রমণ হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার মূত্রনালিতে জটিল সমস্যা রয়েছে।
তিনি বলেন, অর্থাভাবে প্রায় তিন মাস ধরে মেয়ের চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে তার পেট আরও ফুলে যায়। তখন সে বসতে পারে না, শুতে পারে না, এমনকি ঘুমাতেও পারে না। ছোট্ট একটি শিশুর মতো স্বাভাবিক খাবারও খেতে পারে না। দীর্ঘদিন চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাদের সব সামর্থ্য শেষ হয়ে গেছে। এখন হাসপাতালে ভর্তি করানোর মতো টাকাও নেই। সমাজের হৃদয়বান মানুষের কাছে মেয়ের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা চান তিনি।
জুঁইয়ের বাবা জুব্বার আলী অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। মেয়ের চিকিৎসার জন্য নিজের যা সামান্য সম্পদ ছিল, তাও বিক্রি করেছেন। ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে মেয়ের চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু এখন অর্থাভাবে চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
জুঁইয়ের বড় মা ঝরণা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটাকে কষ্ট করতে দেখছেন তিনি। জুঁইয়ের চিকিৎসা করাতে করাতে সংসারে যা ছিল, প্রায় সবই শেষ হয়ে গেছে। তার বাবা একজন কৃষক। দীর্ঘদিন চিকিৎসার খরচ বহন করতে করতে এখন আর তার পক্ষে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, জুঁইয়ের অবস্থা এখন খুবই সংকটাপন্ন। তার পেট, চোখ ও মুখ ফুলে গেছে। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে, রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারে না। তিনি সরকারসহ সমাজের সব হৃদয়বান মানুষের কাছে জুঁইয়ের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা কামনা করেন।
জুঁইয়ের চাচি লিপি খাতুন বলেন, “ওর কষ্ট চোখে দেখা যায় না। রাতে ঘুমাতে পারে না, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমরা আত্মীয়স্বজন মিলে যতটা পেরেছি সাহায্য করেছি, এখন আর পারছি না।”
জুঁইয়ের চাচা শামিম বলেন, “তাদের যা ছিল—জমিজমা, গাছগাছালি—সবই বিক্রি করে জুঁইয়ের চিকিৎসা করিয়েছেন। এখন আর তাদের সামর্থ্য নেই। তাই সবার সহযোগিতা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।” তিনি সবার কাছে জুঁইয়ের চিকিৎসার জন্য সাহায্য ও সহযোগিতা চান।
বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবর আলী বলেন, “জুঁই আমাদের বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অসুস্থতার কারণে সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। এমনকি এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাও দিতে পারেনি। আমরা চাই, সে দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসুক। সহৃদয় ব্যক্তিরা জুঁইয়ের চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসবেন—এই প্রত্যাশা করছি।”
পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন বলেন, পরিবারটি অত্যন্ত অসচ্ছল। জুঁই দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ। তিনি যতটা পেরেছেন সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে জুঁইয়ের চিকিৎসায় পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক জানান, নেফ্রোটিক সিনড্রোম একটি কমন রোগ। রোগটি দুই ধরনের হয় এবং বায়োপসি করার মাধ্যমে তা জানা যায়।
তিনি আরও বলেন, “মেয়েটির যদি রোগটি কম ক্ষতিকারক হয়, তাহলে এ রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। আর যদি এটি ক্ষতিকারক হয়, তাহলে তাকে জীবনভর চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসার মাধ্যমে সে আরোগ্য লাভ করুক—এই কামনা করি।”
জুঁইকে চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক বা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা নিচের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ অথবা সহায়তা পাঠাতে পারেন।


