নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
নরসিংদীতে সাসেক ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণের একটি মামলার নথি পর্যালোচনায় জমির প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ, সড়কের অ্যালাইনমেন্ট এবং স্থাপনার পরিমাপ নিয়ে গুরুতর অসংগতির তথ্য উঠে এসেছে। ভূমি অধিগ্রহণের এলএ কেস ০৯/২১-২২-এ প্রাথমিকভাবে ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হলেও তদন্ত ও পরবর্তী যাচাইয়ে তা কমে চূড়ান্তভাবে ৯ একর ৮৫ দশমিক ১৫ শতকে দাঁড়ায়। অর্থাৎ প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি বাদ পড়ে।
নথি অনুযায়ী, জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় কমেছে ১১০ কোটি ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৪ টাকা। একটি এলএ কেসেই এত বড় অঙ্কের সম্ভাব্য ব্যয় কমে যাওয়ার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে জমির প্রয়োজনীয়তা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক প্রস্তাবের মধ্যে আগে অধিগ্রহণ করা জমি, সরকারি জমি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে কিছু স্থাপনার পরিমাপ বাস্তবতার তুলনায় বেশি দেখানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব কারণে প্রকল্পের নরসিংদী অংশে থাকা অন্য এলএ কেসগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের যাচাই প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এলএ কেস ০৯/২১-২২-এর নথি অনুযায়ী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) প্রথম পর্যায়ে ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। জমির প্রয়োজনীয়তা ও যৌথ তদন্তের ফিল্ডবহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)কে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত শেষে প্রাথমিক প্রস্তাব থেকে ৩ একর ১২ দশমিক ৯২ শতক জমি বাদ দেওয়া হয়। এতে প্রস্তাবিত জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১১ একর ১৩ দশমিক ৪৬ শতক।
পরবর্তী যাচাই ও অ্যালাইনমেন্ট সংশোধনের পর আরও জমি বাদ পড়ে। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত অধিগ্রহণের জন্য রাখা হয় ৯ একর ৮৫ দশমিক ১৫ শতক জমি।
অর্থাৎ প্রথম প্রস্তাবের ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতকের বিপরীতে চূড়ান্ত প্রয়োজনীয়তা দাঁড়ায় ৯ একর ৮৫ দশমিক ১৫ শতক। দুই পর্যায়ের পার্থক্য প্রায় সাড়ে ৪ একর।
নথিতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় কমেছে ১১০ কোটি ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৪ টাকা।
কারারদি মৌজার নথিতে গুগল আর্থে প্রস্তুত করা খসড়া অ্যালাইনমেন্ট নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নথিতে কোথাও সড়কের প্রস্থ ১৬০ ফুট, আবার কোথাও ১৮০ ফুট পর্যন্ত দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
এই অ্যালাইনমেন্টের আওতাধীন এলাকায় রয়েছে সিএনজি স্টেশন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, দোকানপাট ও বহুতল ভবন। তদন্তে এসব স্থাপনার কয়েকটির অবস্থান সওজের আগে অধিগ্রহণ করা জমির অ্যালাইনমেন্ট থেকে প্রায় ১০ ফুটের মধ্যে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় আগে অধিগ্রহণ করা জমি ব্যবহার করে সড়ক উন্নয়ন করা সম্ভব কি না, সেটি পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে অপ্রয়োজনীয় জমি বাদ দিয়ে সওজের আগে অধিগ্রহণ করা জায়গা ব্যবহার করে সড়ক উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বিসিক শিল্পনগরীর সরকারি জমি ও অবকাঠামোর মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিকের সরকারি জমি ও অবকাঠামো বিসিকের নামে ফিল্ডবহিতে অন্তর্ভুক্ত না করে সংশ্লিষ্ট লিজগ্রহীতা শিল্পমালিকদের নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভূমি অধিগ্রহণে মালিকানা নির্ধারণ ক্ষতিপূরণের হিসাবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি জমি কিংবা সরকারি অবকাঠামো কোনো ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তর্ভুক্ত হলে ক্ষতিপূরণের দাবিদার নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে জমির মালিকানা, লিজের ধরন এবং স্থাপনার প্রকৃত মালিকানা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
জমির পাশাপাশি স্থাপনার পরিমাপ নিয়েও তদন্তে অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে।
দক্ষিণ নোয়াদিয়া, ব্রাহ্মণদী, লামপুর, শাষপুর, কুমড়াদি, মুনসেফচর ও কামারগাঁওসহ কয়েকটি মৌজায় বিভিন্ন অবকাঠামোর পরিমাপ যৌথ তদন্তের ফিল্ডবহিতে বাস্তবতার তুলনায় বেশি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।
অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্থাপনার আয়তন সরাসরি ক্ষতিপূরণের হিসাবের সঙ্গে যুক্ত। ফলে স্থাপনার পরিমাপে অসঙ্গতি থাকলে ক্ষতিপূরণের অঙ্কেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণেই এলএ কেসটিতে প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত জমির পরিমাণ এবং চূড়ান্তভাবে প্রয়োজনীয় জমির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
জমির প্রয়োজনীয়তা পুনঃপরীক্ষা ও অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নরসিংদীর তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমের ভূমিকা ছিল বলে নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণের বিভিন্ন বিষয় পুনঃপরীক্ষা ও অপ্রয়োজনীয় জমি বাদ দেওয়ার উদ্যোগের সময় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে একাধিকবার বদলির চেষ্টা করা হয়েছিল। মোট চার দফা বদলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একপর্যায়ে জেলার একজন ভিআইপির টেলিফোনের পর তাকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে।
তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মাহমুদা বেগমকে বদলির সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত বা জমি বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নরসিংদী অংশে সাসেক ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের জন্য এ ধরনের মোট আটটি এলএ কেস রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একটি এলএ কেসেই প্রাথমিক প্রস্তাব থেকে চূড়ান্ত অধিগ্রহণের পরিমাণ কমে প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি বাদ পড়েছে এবং সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ ব্যয় কমেছে ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার বেশি।
এ অবস্থায় অন্য এলএ কেসগুলোতেও একইভাবে প্রাথমিক জমির প্রস্তাব, গুগল আর্থভিত্তিক অ্যালাইনমেন্ট, মাঠপর্যায়ের পরিমাপ, আগে অধিগ্রহণ করা জমি, সরকারি জমির মালিকানা এবং চূড়ান্ত অধিগ্রহণের পরিমাণ পাশাপাশি রেখে যাচাই করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে কোনো জমি শুরুতেই কেন প্রয়োজন হিসেবে দেখানো হয়েছিল এবং পরে কেন তা বাদ দেওয়া হলো—এই দুই প্রশ্নের উত্তর বের করা গেলে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
জানতে চাইলে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান কেয়া বলেন, তিনি যোগদানের পর থেকেই যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ একাধিক তদন্ত চলছে। ভূমি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন দিয়েছে বলে তিনি শুনেছেন, তবে এখনো তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি পাননি।
তিনি বলেন, চলমান অধিগ্রহণের কাজ শেষ করতে বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন। তদন্ত কমিটি যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করেছে, সেগুলোর ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, সরকারি টাকা অপচয়ের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। একই জমি পুনরায় অধিগ্রহণের আওতায় নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
এলএ কেস ০৯/২১-২২-এর নথি পর্যালোচনায় অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রথমত, ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক জমির প্রাথমিক প্রয়োজন কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল?
দ্বিতীয়ত, আগে অধিগ্রহণ করা জমি, সরকারি জমি এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি কীভাবে প্রাথমিক প্রস্তাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলো?
তৃতীয়ত, জমি ও স্থাপনার পরিমাপ প্রথম পর্যায়েই যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রাথমিক প্রস্তাব থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি বাদ পড়েছে এবং এর ফলে সরকারের সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ ব্যয় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার বেশি কমেছে।
এ কারণে শুধু একটি এলএ কেস নয়, সাসেক প্রকল্পের নরসিংদী অংশের বাকি অধিগ্রহণ মামলাগুলোও একই পদ্ধতিতে পর্যালোচনা করা হলে প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে প্রকৃত প্রয়োজন, অতিরিক্ত প্রস্তাব এবং সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমকে বদলির অভিযোগের সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তগুলোর কোনো যোগসূত্র ছিল কি না—থাকলে এর পেছনে কারও ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো স্বার্থ কাজ করেছিল কি না—তা নিরপেক্ষ তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।


