মশিউর রহমান সেলিম, কুমিল্লা :
সরকার আসে সরকার যায়। ক্ষমতার হাতবদল হয়, ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টায়, কিন্তু কিছু অঞ্চলের ভাগ্যলিপি যেন একই জায়গায় স্থবির হয়ে থাকে। এর অন্যতম বড় উদাহরণ কুমিল্লার লাকসাম, বরুড়া ও নাঙ্গলকোট পৌরসভা খাতায়-কলমে এটি একটি উন্নত পৌরসভা হলেও বাস্তবে এখানকার বাসিন্দাদের তেমন কোন নাগরিক সুবিধা এখনো বাড়েনি।
তবে বিগত সরকার গুলো ঢাক-ঢোল বাজিড়ে ৩০বছরে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের মেয়র, কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেও রাস্তাঘাট ও ড্রেন-কালভার্ট সংস্কারের মতো রুটিন কাজের বাইরে আধুনিক পৌরসভা গঠনে দৃশ্যমান কোনো টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পৌরবাসীর।
বিগত ১৭বছরের উন্নয়ন কর্মকান্ডগুলো বাস্তবায়নে অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা ও দুর্নিতীর সঠিক তদন্তের দাবী উঠেছে। বিশেষ করে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিন কুমিল্লার অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক নগরি লাকসামের আয়তন ও জনসংখ্যায় বাড়লেও নাগরিক সুবিধা মেলেনি কাঙ্খিত মাত্রায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শহর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি ‘আধুনিক ও পরিকল্পিত পৌরসভা’ হিসেবে লাকসাম, বরুড়া ও নাঙ্গলকোটকে গড়ে তোলার জন্য যে দূরদর্শী উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, তা বরাবরই উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
জানাযায়, জেলা দক্ষিনাঞ্চলের ৩টি পৌরসভার অধিকাংশ এলাকায় এখনো পর্যন্ত কোনো আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা নিরবচ্ছিন্ন পাইপলাইনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বাসিন্দাদের বাধ্য হয়ে নির্ভর করতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ আয়রন ও আর্সেনিকযুক্ত পানির ওপর। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণ করা হলেও মাস্টারপ্ল্যানের অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই হাট-বাজারসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে কৃত্রিম জলজট দেখা দেয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পানি নিষ্কাশনের মূল আউটলেটের অভাবই এর প্রধান কারণ।
সুনির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন বা বৈজ্ঞানিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা না থাকায় যত্রতত্র ফেলা বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে লাকসাম পৌর এলাকায় একটি ডাম্পিং স্টেশনের কাজ হাতে নেওয়া হলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। একটি প্রথম শ্রেণীর আধুনিক পৌরসভায় যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা আবশ্যক, তার অধিকাংশই অনুপস্থিত লাকসাম পৌর এলাকায়। ৩টি পৌর এলাকায় নেই কোনো জাতীয় ঈদগাহ ও পরিচ্ছন্ন পৌর কবরস্থান, বিনোদন পার্ক, খোলা খেলার মাঠ কিংবা শিশু বিকাশ কেন্দ্র, প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল, শহরের অগ্নিনির্বাপণে ফায়ার হাইড্রেন্ট ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক একাডেমি ও সুইমিং পুল। এছাড়া শহর এলাকায় তীব্র যানজট এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। সুনির্দিষ্ট বাস টার্মিনাল বা পার্কিং জোন না থাকা, অবৈধ ইজিবাইক ও মিশুকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং ফুটপাত দখলের কারণে পথচারীদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।
৩টি পৌরসভার একাধিক সুত্র জানায়,পৌরভাগুলোর সবকয়টি ওয়ার্ডের প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষের এই জনপদে বহুতল ভবন উঠলেও একটি ‘সচল, সুস্থ ও পরিবেশবান্ধব’ নগরের পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের মতে, জনপ্রতিনিধিরা কেবল ৫ বছরের নির্বাচনী মেয়াদ মাথায় রেখে তাৎক্ষণিক সংস্কার কাজ করেন। কিন্তু ৫০ বা ১০০ বছরের দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) না থাকায় স্মার্ট পৌরসভার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পৌরসভা গুলো।
এব্যাপারে বরুড়া ও নাঙ্গলকোট পৌর এলাকার একাধিক বাসিন্দাকে মুঠোফোনে বারবার চেষ্টা করেও কোন তথ্য নেয়া সম্ভব হয়নি তবে লাকসাম পৌরসভার বাসিন্দা জামাল আহমেদ বলেন, কেবল রাস্তাঘাট সংস্কার একটি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। লাকসামকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট ও মানবিক শহরে রূপান্তর করতে হলে দলমত নির্বিশেষে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। সুপেয় পানি, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট নিরসন, সবুজায়ন এবং যেকোনো বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে ‘গণশুনানি’র মাধ্যমে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করাই এখন সময়ের দাবি। আগামীতে যারা পৌরসভার দায়িত্বে আসবেন, তাদের এখন থেকেই এই দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
লাকসাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি জাফর আহমেদ বলেন, প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হিসেবে নাগরিকদের ওপর সর্বোচ্চ হারে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি এবং অন্যান্য সেবা ফি আদায় হচ্ছে। করের বোঝা বাড়লেও সে অনুপাতে উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। পরিকল্পিত বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থার অভাবে বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় ময়লা-আবর্জনাও জমে থাকে। বেশ কিছু এলাকার রাস্তাঘাট খানাখন্দে ভরা এবং রাতের বেলায় সড়ক বাতি নিয়মিত জ্বলে না। কাগজে-কলমে বা আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখিয়ে একটি পৌরসভা প্রথম ম্রেণীর সরকারি স্বীকৃতি পেতে পারে, কিন্তু নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত না হলে সেই স্বীকৃতির বাস্তবিক কোনো মূল্য থাকে না।


