বাউফল (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা
বর্ষার ভেজা বিকেল। টিনের চালায় টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, কাদা মাখা সরু গ্রাম্য পথ, আর বাজারের এক কোণে লালচে-বাদামি মখমলি খোসায় ঢাকা ফলের স্তূপ। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, যেন মাটির রঙে রাঙানো ছোট ছোট গোলক ছড়িয়ে আছে। কাছে গেলেই ভেসে আসে এক পরিচিত গন্ধ, যা অনেকের শৈশবকে নিঃশব্দে টেনে নিয়ে যায় বহু বছর আগের কোনো বর্ষার দুপূরে। সেটিই বিলাতি গাব, বাউফলের বর্ষার এক আবেগময় পরিচয়।
বাউফল উপজেলার কালাইয়া, নওমালা, কনকদিয়া, ধুলিয়া, আদাবাড়িয়া, দাসপাড়া এবং তেঁতুলিয়া নদীঘেঁষা চরাঞ্চলের অসংখ্য বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় ও উঁচু জমিতে এখনো দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো বিলাতি গাবগাছ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ফলের মৌসুম। ভোর হতেই কৃষকেরা গাছে ওঠেন, পাকা ফল নামান, তারপর ঝুড়ি বা প্লাষ্টিকের ক্রেটে ভরে নিয়ে আসেন কালাইয়া সোমবারের হাট, বাউফল বাজার, নওমালা বাজারসহ বিভিন্ন স্থানীয় আড়তে।
এই ফলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি প্রজন্মের স্মৃতি। একসময় বর্ষার ছুটির দিনে শিশু-কিশোরেরা দল বেঁধে গাবগাছের নিচে ভিড় করত। গাছ থেকে পাকা ফল পড়ার অপেক্ষা, মাটিতে পড়ে যাওয়া ফল কুড়িয়ে নেওয়া, তারপর বাড়ি ফিরে ধুয়ে খাওয়া সবই ছিল গ্রামীণ জীবনের এক সহজ আনন্দ। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল। ফলটি এখন বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে, কিন্তু তার গন্ধে আজও লুকিয়ে আছে ভেজা মাটির সেই পুরোনো দিনগুলো।
উপজেলার চরকালাইয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আবুল হাসান মুনসুর (৮২) বলেন, ছোটবেলায় বর্ষা মানেই ছিল গাব পাকা। স্কুল ছুটি হলে বন্ধুরা মিলে গাছের নিচে বসে থাকতাম। তখন কেউ এই ফল বিক্রি করত না, সবাই ভাগাভাগি করে খেত। এখন বাজারে এত গাব দেখি, কিন্তু সেই দিনের আনন্দ আর পাই না।
কালাইয়া বন্দর কাঁচাবাজারের আড়তদার মো. মিলন বলেন, মৌসুমের শুরুতে বিলাতি গাবে কুড়ি ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে দাম নেমে আসে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। বড় আকারের ভালো মানের ফলের চাহিদা বেশি। এসব গাব অধিকাংশই ঢাকার কিছু ফল ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠনো হয়।
দাসপাড়া গ্রামের আলী হোসেন (৫৮) নামে এক কৃষক বলেন, আগে এই ফলের তেমন দাম ছিল না। অনেক ফল গাছের নিচেই পড়ে নষ্ট হতো। এখন বাজারে কমবেশি চাহিদা আছে।
পুষ্টিবিদ ডা. আহসান উল ইসলাম বলেন, বিলাতি গাব শুধু স্বাদের জন্য নয়, পুষ্টিগুণের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা গাব খেতে অনিহা প্রকাশ করলেও এতে রয়েছে ভিটামিন এ, সি, খাদ্যআঁশ এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন, এই অঞ্চলে বাড়ির আঙ্গিনায়, পুকুর পাড়ে বা বাড়ির কোন উঁচু স্থানে প্রাকৃতিক ভাবে জন্ম নেয় বিলাতি গাব। বিলাতি গাবকে পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক চাষের আওতায় আনা গেলে এটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফল হতে পারে।


