Homeজাতীয়সার্জিও গোরের সফরে কৌশলগত নতুন চাপ

সার্জিও গোরের সফরে কৌশলগত নতুন চাপ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের এক মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোর বাংলাদেশে তিন দিনের সফর শেষ করলেন। এ সফরের বার্তা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি-সবই এখন আলোচনায়। ইন্দো-প্যাসিফিকের ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নানা খাতে আগামীর বাংলাদেশের কৌশল কী হবে, এ সফরে যেন তাই জানতে চাওয়া হয়েছে। কেউ কেউ গোরের এই সফরকে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত চাপ বলে মনে করছেন।

কূটনৈতিক মহলগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো পরাশক্তিগুলোর নানা চাওয়াপাওয়া বাংলাদেশ কীভাবে সমন্বয় করবে, তাই যেন এই সফরের বৈঠকের আড়ালে মুখ্য হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশ কতটা যুক্তরাষ্ট্র বা কতটা চীনমুখী-তারই হিসাবনিকাশ যেন করা হচ্ছে নতুন করে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে নানা সমঝোতা ও চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের আগামীর গতিপ্রকৃতি-সবকিছু বাংলাদেশ কীভাবে সামাল দেবে, সে প্রশ্নের উত্তরই যেন খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে এই সফরে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সার্জিও গোরের এই সফরে বাংলাদেশের চাওয়াপাওয়া ও স্বার্থের বিষয়টি সে অর্থে গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কী চায় এবং কীভাবে চায়, সেটি। সফরে এসে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সার্জিও গোরের একান্ত বৈঠকের সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, এই সাক্ষাতে কোনো নিয়মভঙ্গ হয়নি, তবে বিষয়টি এমন মনে হয়েছে যে, ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখার চেষ্টা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক ওই বৈঠককে কিছুটা সন্দেহের চোখেও দেখেছেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ যুগান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছে কী আশা করে, সে মেসেজটি পৌঁছে দেওয়াই সার্জিও গোরের সফরের মূল উদ্দেশ্য মনে হয়েছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়া, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরে কী কী আলাপ হয়েছে, চীনের সঙ্গে নানা আদানপ্রদান-এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌতূহল বেশি মনে করি। ইরান বিষয়ে বাংলাদেশকে তারা পাশে চাইতে পারে। পাশাপাশি বিনিয়োগ বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনাকাটার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।

তিনি বলেন, তবে কয়েকটি বিষয় আমাদের চিন্তিত করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সার্জিও গোরের বৈঠকের পর ড. খলিলুর রহমানের মধ্যে অস্বস্তি ফুটে উঠেছে। অতিথি হিসাবে বাংলাদেশে এসে অন্য দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করতেই পারেন। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সার্জিও গোরের বৈঠক কিছুটা ‘আনইউজুয়াল’ মনে হয়েছে।

এতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করা হচ্ছে কি না, বিষয়টি সামনে এসে যায়। তবে চিন্তার কিছু নেই। কারণ, বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া-সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে একটা অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে আছে। এটি কারও জন্যই সুখকর হবে বলে মনে করি না।

বৃহস্পতিবার তিন দিনের সফরে প্রথমবার বাংলাদেশে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর। ঢাকায় পৌঁছেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে আলোচনার পর বৃহস্পতিবার রাতে গণমাধ্যমকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটি ইতিবাচক দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতাসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকের বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে নিজের এক্স হ্যান্ডেলের এক পোস্টে সার্জিও গোর জানান, আমার প্রথম বাংলাদেশ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদার করতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি আছে।

শুক্রবার সকালে সার্জিও গোর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শনে যান।

সফরের শেষ দিন সার্জিও গোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশে ওয়্যার হাউজিং, সয়াবিন, তুলা, গম এবং অন্যান্য কৃষি খাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতের বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের বিশেষ আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাইভেট সেক্টরের একটি প্রতিনিধিদল শিগ্গিরই বাংলাদেশ সফর করবে বলেও জানা যায়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ হলে তা দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করবে। কিন্তু এটিও মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশ যেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের দিকে আর ঝুঁকে না পড়ে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, বৈশ্বিক শক্তি বা বড় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কাজ করতে গেলে নানা ধরনের চাপ আসাটাই স্বাভাবিক। তবে এসব চাপ সামাল দেওয়ার উত্তম পন্থা হলো অভ্যন্তরীণভাবে নিজেদের শক্তিশালী করা। যুগান্তরকে তিনি বলেন, মোটা দাগে অভ্যন্তরীণ শক্তি বলতে রাজনৈতিক সহমর্যাদা বেশি থাকা, শাসনব্যবস্থা পরিচালনার দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো থাকাকে বোঝায়। এগুলো যখন থাকবে, তখন বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে কথা বলে সুবিধা পাওয়া যাবে।সমস্যা হলো-অনেক সময় আমরা কথা দিই; কিন্তু সেগুলো ‘ইমপ্লিমেন্ট’ করতে পারি না। সে কারণেই জটিলতাগুলো তৈরি হয়। তাই কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি হলে তা কাজের জন্য শক্তি জোগাবে। ঠিক এজন্যই কথা দেওয়ার আগে চিন্তা করতে হবে-কোনটা আমি আসলেই দিতে পারব আর কোনটা দিতে পারব না। খালি অনুরোধে ঢেঁকি গিললে চলবে না। সব কথা বলতে হবে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে; কোনো দলগত স্বার্থে নয়। সব দেশই তার স্বার্থ পূরণ করতে চায়। সেখানে যুক্তিসংগতভাবে আমাদের কথাগুলো বলতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ সফরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হলেও তিনি এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। ফলে শুধু ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করার কারণে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আলোচনার বিস্তারিত জানায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা-বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় ইসু্যু বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, একটা সময় যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় প্রিজম দিয়ে বাংলাদেশকে দেখত বলে মনে করা হতো। সার্জিও গোরের সফর আমাদের অনেকটা সে সময়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বহুলাংশে যুক্তরাষ্ট্রচালিত হলেও সময় সময় বাংলাদেশ তার প্রায়োরিটি অনুযায়ী ‘দ্বিপাক্ষিক এলিমেন্ট’ যোগ করতে পেরেছে। এই সফর আবার যেন সেই সমীকরণে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করে কোনো সক্রিয় উদ্যোগ অনুপস্থিত। বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থটুকু পূরণ করতে বাংলাদেশ উদ্গ্রীব মনে হয়েছে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের অপেক্ষা না করে নিজ প্রায়োরিটি অনুযায়ী আলোচ্যসূচি নিয়ে এগোতে হবে। নইলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক থেকে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা জরুরি। এ চুক্তির সম্ভাব্য ফল-আউটগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো মোকাবিলায় মনোযোগী হতে হবে। পাশাপাশি সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আছে-এমন চুক্তি ও সম্ভাবনার ব্যাপারে অধিকতর সতর্ক হওয়া উচিত। সার্জিও গোরের সফর বাংলাদেশ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নিয়ে ভাবতে তাগাদা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশকে আশু ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে সজাগ করবে। সমান্তরালভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উপলব্ধি করাবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments